দম ফাটা হাসির গল্প ব্যা: সুকুমার রায়

চাষা ও বুদ্ধিমান ওকিল - ব্যা গল্প 

Sukumar Ray-এর বিখ্যাত হাস্যরসাত্মক গল্প “ব্যা” বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় রচনা। গল্পটির মূল আকর্ষণ হলো একজন গরিব চাষা, এক লোভী মহাজন এবং এক চালাক ওকিলকে ঘিরে তৈরি হওয়া মজার পরিস্থিতি।
দম ফাটা হাসির গল্প ব্যা: সুকুমার রায়

চলুন গল্লটি একবার পড়ি, কেমন মজার গল্প না পড়লে বোঝা যাবে না। 

গল্পের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

এক গরিব চাষা বহু বছর আগে মহাজনের কাছ থেকে ২৫ টাকা ধার নিয়েছিল। সুদে-আসলে সেই ঋণ বেড়ে ৫০০ টাকায় পৌঁছায়। চাষা অনেক কষ্টে ১০০ টাকা জোগাড় করলেও মহাজন পুরো টাকা দাবি করে এবং মামলা করে বসে।

এক বুদ্ধিমান ওকিল চাষাকে পরামর্শ দেয় যে আদালতে কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু পাঠার মতো “ব্যাঁ” বলতে হবে। আদালতে চাষা ঠিক তাই করে। সবাই তাকে পাগল মনে করে এবং ওকিল যুক্তি দেখায় যে এমন একজন পাগল মানুষের কাছ থেকে ঋণের বৈধ দাবি করা যায় না। ফলে মামলা খারিজ হয়ে যায়।

কিন্তু গল্পের সবচেয়ে মজার অংশ আসে শেষে। মহাজন যখন টাকা চাইতে আসে, চাষা শুধু “ব্যাঁ” বলে। এরপর নিজের ওকিলও পারিশ্রমিক চাইতে এলে চাষা তাকেও একই উত্তর দেয়—“ব্যাঁ”। ফলে ওকিলও নিজের পাওনা আদায় করতে পারে না।

সুকুমার রায় এর ব্যা গল্প - উকিলের বুদ্ধি গল্প

এক গ্রামে এক গরিব চাষা বাস করত। বহু বছর আগে সে এক মহাজনের কাছ থেকে মাত্র পঁচিশ টাকা ধার নিয়েছিল। কিন্তু সুদের পর সুদ জমে সেই পঁচিশ টাকা একসময় পাঁচশো টাকায় গিয়ে দাঁড়াল।

গরিব চাষা অনেক কষ্ট করে একশো টাকা জোগাড় করল। সে মহাজনের কাছে গিয়ে বলল,

— মহাজন মশাই, আমি গরিব মানুষ। অনেক কষ্টে এই একশো টাকা জোগাড় করেছি। এটা নিন, বাকি টাকা মাফ করে দিন।

কিন্তু মহাজন ছিল খুব কঠোর। সে বলল,

— না, পাঁচশো টাকার এক পয়সাও কম হবে না। টাকা দিতে না পারলে তোমাকে জেলে যেতে হবে।

এ কথা শুনে চাষা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। কী করবে ভেবে সে কূলকিনারা পেল না।

ঠিক তখনই এক চতুর ওকিল তার কাছে এসে বলল,

— কী ব্যাপার? এত চিন্তিত কেন?

চাষা সব কথা খুলে বলল।

ওকিল বলল,

— যদি তোমার কাছে থাকা একশো টাকা আমাকে দাও, তাহলে তোমাকে বাঁচানোর একটা উপায় বলতে পারি।

চাষা আশায় বুক বাঁধল। সে ওকিলের হাত ধরে বলল,

— আপনি যদি আমাকে বাঁচাতে পারেন, আমি অবশ্যই টাকা দেব।

তখন ওকিল বলল,

— শোনো, আদালতে যখন তোমাকে জেরা করা হবে, তখন কোনো প্রশ্নের উত্তর দেবে না। সবাই যা-ই বলুক, তুমি শুধু পাঠার মতো "ব্যাঁ" বলবে। আর কিছু বলবে না। যদি এটা করতে পারো, তাহলে তুমি বেঁচে যাবে।

চাষা রাজি হয়ে গেল।

কয়েক দিন পরে আদালতে বিচার শুরু হলো। মহাজনের পক্ষের বড় ওকিল চাষাকে প্রশ্ন করল,

— তুমি কি সাত বছর আগে মহাজনের কাছ থেকে পঁচিশ টাকা ধার নিয়েছিলে?

চাষা বলল,

— ব্যাঁ।

ওকিল আবার জিজ্ঞেস করল,

— বলো, তুমি টাকা নিয়েছিলে কি না?

চাষা আবার বলল,

— ব্যাঁ।

ওকিল রেগে গিয়ে বলল,

— হুজুর, দেখুন তো আসামির অবস্থা!

হাকিম চাষাকে ধমক দিয়ে বললেন,

— আবার যদি এমন করো, তোমাকে শাস্তি দেব!

চাষা ভীত মুখে বলল,

— ব্যাঁ...

হাকিম অবাক হয়ে বললেন,

— লোকটা কি পাগল নাকি?

এই সুযোগে চাষার পক্ষের ওকিল উঠে দাঁড়াল। সে বলল,

— হুজুর, এ কি আজকের পাগল? এ জন্ম থেকেই পাগল। এর কোনো বুদ্ধি নেই। এটা কি জানে ঋণ কী? দলিল কী? সই কী? কেউ যদি ওকে কোথাও আঙুলের ছাপ দিতে বলে, ও দিয়ে দেয়। মহাজন জেনে-শুনেই এই অসহায় পাগলকে ঠকাতে চেয়েছে।

ওকিল আরও অনেক যুক্তি দেখাল।

হাকিম সব কথা শুনে বললেন,

— মামলা খারিজ করা হলো।

চাষা মুক্তি পেয়ে গেল।

মহাজনের তো মাথায় হাত! আদালতের বাইরে এসে সে চাষাকে বলল,

— আচ্ছা, চারশো টাকা মাফ করে দিলাম। শুধু ওই একশো টাকা আমাকে দিয়ে দাও।

চাষা বলল,

— ব্যাঁ।

মহাজন আবার বলল,

— আরে, আমি তো তোমার উপকার করছি!

চাষা আবার বলল,

— ব্যাঁ।

মহাজন অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। শেষে রাগে-দুঃখে চলে গেল।

চাষা তখন খুশি মনে গ্রামের পথে রওনা হলো। এমন সময় তার নিজের ওকিল এসে সামনে দাঁড়াল।

ওকিল বলল,

— কোথায় যাচ্ছ? আমার পাওনাটা দিয়ে যাও। আমরা তো একশো টাকায় চুক্তি করেছিলাম। আমি তোমাকে মামলা থেকে বাঁচিয়েছি। এবার টাকাটা দাও।

চাষা অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— ব্যাঁ।

ওকিল বলল,

— আরে বাপু, এখন আর নাটক করো না। টাকাটা বের করো।

চাষা আবার বলল,

— ব্যাঁ।

ওকিল রেগে গেল।

— দেখো, আমার সঙ্গে চালাকি কোরো না!

চাষা শান্তভাবে আবার বলল,

— ব্যাঁ।

ওকিল যতই বোঝায়, ধমক দেয়, অনুরোধ করে, চাষা ততই "ব্যাঁ" বলতে থাকে।

অনেকক্ষণ পরে ওকিল বুঝতে পারল, আদালতে মহাজনকে বোকা বানানোর যে কৌশল সে শিখিয়েছিল, চাষা এখন সেই একই কৌশল তার ওপরেই প্রয়োগ করছে।

শেষ পর্যন্ত ওকিলও একশো টাকা পেল না।

চাষা নিজের টাকা নিয়ে হাসতে হাসতে গ্রামের পথে চলে গেল, আর ওকিল মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

গল্পের নীতিকথা

অন্যকে ঠকানোর জন্য যে বুদ্ধি ব্যবহার করা হয়, সেই বুদ্ধি একদিন নিজের বিরুদ্ধেও ফিরে আসতে পারে। তাই বুদ্ধি সবসময় সৎ কাজে ব্যবহার করা উচিত এবং এমন কোন মানুষ কে বুদ্ধি জানানো উচিত নয় যে, তোমার বুদ্ধি তোমার উপরই প্রয়োগ করবে। 

উকিলের বুদ্ধি (গল্প: “ব্যা”) – প্রশ্ন ও উত্তর

১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হল: 

১. চাষা কত টাকা ধার নিয়েছিল?

উত্তর: ২৫ টাকা।

২. সুদে আসলে চাষার ঋণ কত দাঁড়িয়েছিল?

উত্তর: ৫০০ টাকা।

৩. চাষা কত টাকা জোগাড় করতে পেরেছিল?

উত্তর: ১০০ টাকা।

৪. চাষার জন্য প্রথমে কে সাহায্যের কথা বলেছিল?

উত্তর: এক বুদ্ধিমান উকিল।

৫. উকিল চাষাকে আদালতে কী করতে বলেছিল?

উত্তর: সব প্রশ্নের উত্তরে শুধু “ব্যাঁ” বলতে বলেছিল।

৬. আদালতে চাষা কী উত্তর দিত?

উত্তর: শুধু “ব্যাঁ” বলত।

৭. উকিলের এই কৌশলের কারণে কী হয়েছিল?

উত্তর: চাষাকে পাগল হিসেবে দেখানো হয় এবং মামলা খারিজ হয়ে যায়।

৮. মহাজন আদালতের বাইরে কী করতে চেয়েছিল?

উত্তর: ৪০০ টাকা মাফ করে দিয়ে বাকি ১০০ টাকা চাইতে চেয়েছিল।

৯. চাষা মহাজনকে কী উত্তর দিয়েছিল?

উত্তর: “ব্যাঁ”।

১০. গল্পের শেষে উকিল কী চাইতে গিয়েছিল?

উত্তর: নিজের পারিশ্রমিক ১০০ টাকা।

১১. চাষা উকিলকে কী উত্তর দিয়েছিল?

উত্তর: “ব্যাঁ”।

১২. গল্পের মূল শিক্ষা কী?

উত্তর: অন্যকে ফাঁকি দিতে গিয়ে করা চালাকি নিজের বিরুদ্ধেও ফিরে আসতে পারে।


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url