অপদার্থ - সত্যজিৎ রায়
যাকে সবাই অপদার্থ ভাবত, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটিই সমাজের আসল অপদার্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় রচিত ‘অপদার্থ’ একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও চিন্তাশীল গল্প। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ক্ষেত্রমোহন সেন বা সেজো কাকা, যাকে পরিবারের সবাই ‘অপদার্থ’ বলে মনে করত। জীবনের নানা ব্যর্থতা, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা এবং কর্মদক্ষতার অভাবের কারণে তিনি কখনো সমাজের স্বীকৃতি পাননি।
কিন্তু গল্পের শেষদিকে পাঠক উপলব্ধি করেন যে মানুষের মূল্য শুধুমাত্র সাফল্য বা কর্মক্ষমতার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। গল্পটি খুব চমৎকার, একজন চিন্তাশীল মানুষের জন্য গল্পটি খুবই উপকারী হবে।
সত্যজিৎ রায়ের "অপদার্থ" গল্প
অপদার্থ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় 'চকমুখী' পত্রিকায় ১৩৯০ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৯৮৩ সালে।
অপদার্থ কথাটা অনেক লোক সম্বন্ধে অনেক সময় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন আমাদের চাকর নবকে, "নব, তুই একটা অপদার্থ" - এই কথাটা ছেলেবেলায় মার মুখে অনেকবার শুনেছি।
নব কিন্তু কাজ ভালোই করতো। দোষের মধ্যে সে ছিল বেজায় ঘুম কাতুরে। দিনের বেলা প্রায়ই একটু টেনে ঘুম দেওয়ার ফলে বিকেলে চায়ের জলটা চড়াতে চারটের জায়গায় হয়ে যেত সাড়ে চারটে। কাজেই মা যে তাকে অপবাদটা দিতেন সেটা ছিল রাগের কথা।
কিন্তু সেজো কাকার বেলায় অপদার্থ কথাটা যেরকম লাঞ্ছনাই ছিল, সেরকম আর কারোর বেলায় হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
সেজো কাকা। মানে যার ভালো নাম ক্ষেত্রমোহন সেন, ডাক নাম খেতু। বাবারা ছিলেন পাঁচ ভাই। বাবাই বড়, তারপর মেজো, সেজো, সোনা আর ছোট। পাঁচের মধ্যে সেজো বাদে আর সকলেই জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন।
বাবা ছিলেন নামকরা উকিল। মেজো সম্মানিত অধ্যাপক, ইতিহাসে ডাবল এমএ। সোনা কাকা কলকাতায় বাড়ি তুলেছিলেন আর ছোট কাকা কালোয়াতি গানে বড় বড় মুসলমান ওস্তাদের বাহবা আর ৩৬ টা সোনার উপর মেডেল পেয়েছিলেন ধনী সমজদারদের কাছ থেকে।
আর সেজো কাকা? তাকে নিয়েই এই গল্প। তাই তার কথাটা এক কথায় বলা যাবে না।
সেজো কাকার জন্মের মুহূর্তে নাকি ভূমিকম্প হয়েছিল। অনেকের মতে সেই কারণে নাকি তার ঘিলুতে জট পাকিয়ে যায়, আর তাই তার এই দশা। আমার আর চিকেন পক্স একবার না একবার প্রায় সব শিশুদেরই হয়। সেজো কাকার এই দুটো তো হয়েই ছিল। সেই সঙ্গে কোনো না কোনো সময় হয়েছিল হুপিংকাশি, ডিপথেরিয়া, ডেঙ্গু, একজিমা, আসল বসন্ত।
শিশু বয়সে সাতবার কাঁদতে কাঁদতে হিচকি উঠে নীল হয়ে সেজো কাকা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। সাত বছরে সেজো কাকার তোতলাও দেখা দেয়। সাড়ে নয়ে পেয়ারা গাছ থেকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে তোলামও সেরে যায়। কিন্তু এই পতনের ফলে সেজো কাকার গোড়ালি ভেঙে যায়। ডাক্তার বিশ্বাস সেটাকে ঠিকমত জোড়া দিতে না পারায় সেজো কাকাকে সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটতে হতো।
এই খোঁড়ানোর জন্য তার আর খেলাধুলা করা সম্ভব হয়নি। হাতের টিপের অভাবে ক্যারাম আর মাথা খেলে না বলে তাসপাসাও হয়নি। সেজু কাকা স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু পরপর তিনবার এফএ পরীক্ষায় ফেল হওয়ার পর ওর বাবা, মানে আমার ঠাকুর দাদা, নিজেই ওর পড়াশোনা বন্ধ করে দেন।
বলেন, "খেতু, তুই যখন একেবারেই অপদার্থ, তখন তোর এডুকেশনের পেছনে খরচ করা মানে টাকা জ্বলে দেওয়া। তবে গলগ্রহ হয়ে থাকতে দেওয়াও তো চলে না। শোন, তুই আজ থেকে ভোম্বলের সঙ্গে বাজারে যাবি। শাকসবজি, মাছ, মাংস চিনে নিবি। তারপর থেকে সংসারের বাজারটা তুই কি করবি।"
ভোম্বল কাকা হলেন বাবার এক দুঃসম্পর্কের ভাই। আমাদের বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করেছেন, মানুষ হয়েছেন। সেজো কাকা বেশ কিছুদিন বাজারে গেলেন ভোম্বল কাকার সঙ্গে। তারপর একদিন, সেদিন বাড়িতে লোক খাবে, ঠাকুরদা সেজো কাকার পকেটে দুটো দশ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বললেন, "দেখি তুই কেমন জিনিসপত্র চিনেছিস। আজ বাজারের ভার তোর ওপর। যা।"
সেজো কাকাকে দিয়ে বাজার আর হলো না। কারণ কাকার পাঞ্জাবির পকেটে ফুটো। নোট দুখানা বাজারে পৌঁছানোর আগেই পথে কোথায় গলে পড়েছে, আচ্ছা আপনারাই বলুন।
এরপর থেকে কে আর কাকাকে ট্রাস্ট করবে? আমার প্রথম স্মৃতিতে সেজু কাকার বয়স ৩৩। আর আমার তিন। কালীপূজোর দিন সন্ধেবেলা ঘটনাটা মনে আছে। কেন সেটা আরেকটু বললেই বোঝা যাবে।
সেজো কাকা বারান্দার মেঝেতে হামাগুড়ি দিচ্ছেন, আর আমি তার পিঠে চড়ে ঘোড়া ঘোড়া খেলছি। পাশের বাড়ি থেকে হঠাৎ একটা জ্বলন্ত উড়ন্ত তুবড়ি এসে বারান্দার তক্তপোষের উপর পড়তেই "সর্বনাশ" বলে সেজো কাকা শট উঠে দাঁড়ালেন। তার ফলে আমি পিঠ থেকে ছিটকে পড়লাম শান বাঁধানো মেঝেতে।
আর সঙ্গে সঙ্গে মাথা ফেটে রক্তারক্তি কান্ড। সেদিন অবশ্যই সেজো কাকাকে ভয়ঙ্কর সব কথা শুনতে হয়েছিল বাড়ির প্রায় সকলের কাছ থেকেই। আমার কিন্তু একটু দুঃখ হয়েছিল কাকার জন্য। কেউ তাকে গ্রাহ্য করে না, এমনকি মানুষের মধ্যেই ধরে না। তাই বয়সের সঙ্গে আমার কাকার উপর একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল।
মাঝারি হাইট, মাঝারি রং, মুখে সবসময় একটা খুশি আর দুঃখ মেশানো ভাব মনে হতো। সব মানুষেরই বুদ্ধি হবে, সব মানুষই করিতকর্মা হবে, তার কি মানে? শহর ভর্তি এত লোকের মধ্যে একটা লোক যদি সেজো কাকার মতো হয়, তাতে দোষ কি?
আমি তাই ফাঁক পেলেই তার একতলার কোণের ঘরটায় গিয়ে সেজো কাকার সঙ্গে বসে গল্প করতাম। কদিন গিয়েই এটা বুঝেছিলাম, সেজো কাকাকে গল্প বলতে বলে কোন লাভ নেই। কারণ তার কোন গল্পই শেষ পর্যন্ত মনে থাকে না।
"তারপর কি হলো সেজো কাকা?"
"তারপর... তারপর... তারপর..."
তারপর গলার স্বর তারপর তারপর বলতে বলতে ক্রমে দম ফুরানো হারমোনিয়ামের মত ক্ষীণ হয়ে আসে। সে কাকা গল্প থেকে গুনগুন বেসুর গানে চলে যান। শেষটায় গানও ফুরিয়ে গিয়ে কাকার মাথাটা ঘুমে ঢুলতে থাকে। বুঝতে পারি গল্পের বাকি অংশ মনে করার মেহনত কাকার পোষাচ্ছে না।
না, তাকে সেই অবস্থায় রেখেই আমি পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে আসি।
আমার যখন বছর ১২ বয়স তখন একদিন তার ঘরে গিয়ে দেখি তিনি একটা মোটা বই খুলে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন।
জিজ্ঞেস করাতে বললেন, "আয়ুর্বেদের বই।" বললাম, "ও বই পড়ে কি হবে সেজো কাকা?" কাকা একটু ভেবে গম্ভীরভাবে
বললেন, "এটাও তো একটা ব্যারাম তাই না কোনটা? এই যে আমার দ্বারা কিছু হচ্ছে না,
কিছু মনে থাকে না, কিছু মাথায় ঢোকে না, এটা নিশ্চয়ই একটা রোগ। কি আর বলবো!"
বললাম, "তা তো হতেই পারে সেজো কাকা, তাহলে চিকিৎসা হবে না কেন?
তুমি নিজেই চিকিৎসা করবে নাকি?" আমি জানতাম যে সেজো কাকার এই অপদার্থতার জন্য তাকে ডাক্তার দেখানোর কথা
কেউ কোনদিন ভাবেনি। সত্যি বলতে কি, ওর ছেলেবেলার সেই এক গাদা ব্যারামের পর ওর আর বিশেষ কোন অসুখ
টসুক করেনি। স্বাস্থ্যটা ওর মোটামুটি ভালোই ছিল। সেজু কাকা বলে চললেন, "চকবাজারে ফুটপাথে। বইটা পড়েছিল দশ আনা দিয়ে কিনে।
এনেছি বোধহয় কাজে দেবে মনে হচ্ছে। আমার ব্যারামের জন্য আয়ুর্বেদি চিকিৎসা আছে।"
বুঝলি, দুদিন বাদে তখন বর্ষাকাল। বিকেলে সেজো কাকার ঘরে গিয়ে দেখি উনি বেরোবার তোর জোর করছেন। পায়ে ক্যানভিসের জুতো, মালকোচা মেরে পড়া ধুতি,
গলায় জড়ানো সুতির চাদর আর হাতে ছাতা। বললেন, "ভরচাজপাড়ায় ভাঙা শিব মন্দিরটার
পিছনে একটা গাছ আছে, খবর পেয়েছি। তার শিকর আমার চাই। ওইটা পেলেই না ব্যাস,
নিশ্চিন্তেই শিকরটা আমি... শিকরটা আমি যাই আমি।"
শিকরটা হবে আমার। সেজু কাকা বেরিয়ে পড়লেন। আকাশ
ঘোলাটে হয়ে আসছে। তেমন তেমন বৃষ্টি নামলে কাকার প্ল্যান ভেজতে যাবে। আমি ঘণ্টাখানিক নিচে ঘুরঘুর করে দোতলায় নিজের ঘরে চলে গেলাম।
দক্ষিণের জানলা দিয়ে সামনের রাস্তাটা দেখা যায়। বৃষ্টি নামলো না।
যখন হব হব তখন দেখি সেজো কাকা ফিরছেন। দূর দাঁড় করে নিচে নেমে সদর দরজার মুখে কাকার
সঙ্গে দেখা পেলে "শিকর নারে ভুল হয়ে গেল। একটা একটা টর্চ নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। জায়গাটা জংলার বেজায় অন্ধকার", কিন্তু ওটা কি কাকার কথার মধ্যেই চোখ পড়েছে আমার খদ্দরের পাঞ্জাবির বুকে
লাল রঙের ছোপ। "হ্যাঁ হ্যাঁ তাইতো তাইতো। এটা তোকে খেয়াল করিনি এতক্ষণ।"
এটা পাঞ্জাবি খুলতেই বের হলো একটা জোঁক। ভীম যেমন দুর্যোধনের বুকের রক্ত
খেয়েছিল তেমনি ইনি সেজো কাকার বুকের রক্ত খেয়ে ফুলে ঢোল। টোকা দিতেই টপ করে মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু একটা জোঁকে আর সেজোকা কি হবে? কাঁধ কনুই কোমর পায়ের গুলি হাঁটু গোড়ালি
সব জায়গা মিলিয়ে ১৪ টা জুঁক বের হলো কাকার গা থেকে। পাঁচ ছ আউন্স রক্ত যে তার আজ খোঁয়া গেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বলাই বাহুল্য তার আয়ুর্বেদ চর্চাও এই
একটি ঘটনাই দিল বন্ধ।
করে পড়াশোনায় আমি ছিলাম রীতিমত ভালো। আমাদের এফএ এন্ট্রেন্সের যুগ শেষ হয়ে ম্যাট্রিক চলছে। পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় থার্ড হয়ে বিজ্ঞান পড়বো বলে চলে এলাম কলকাতায়। হোস্টেলে থেকেই এমএসসি পর্যন্ত
পড়ে পদার্থ বিজ্ঞানে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে চলে যাই আমেরিকায়। শেষ পর্যন্ত গবেষক হিসেবে আমার
বেশ খ্যাতি হয়। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ও গবেষণার কাজ আমি একসঙ্গে চালাতে
থাকি। বাইরে থাকার ফলে সেজো কাকার সঙ্গে যোগসূত্র ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। একবার তখন আমি সবে অধ্যাপনা শুরু
করেছি, মার চিঠিতে এক অদ্ভুত খবর পেলাম। সেজো কাকা নাকি ফিল্মে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন। এখানে বলি যে সেজো কাকার সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের চেহারার একটা সাদৃশ্য ছিল।
দেহের গঠন মোটেই এক নয়। সেজো কাকা ছিলেন পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি, তবে নাক চোখ মুখের
সাদৃশ্য সকলের চোখেই ধরা পড়তো। পরমহংসদেব সম্বন্ধে একটা ফিল্ম তোলা হবে এবং তাতে বিবেকানন্দের ভূমিকা আছে। খবর
পেয়ে সেজো কাকা নাকি সরাসরি প্রযোজকের সঙ্গে দেখা করে অভিনয় করার ইচ্ছে প্রকাশ
করেন। চেহারায় মিলের জন্য পাঠটা পেতে নাকি তার কোন অসুবিধা হয়নি। কিন্তু হপ্তাখানেক
বাদেই আরেকটা চিঠিতে জানলাম, কাকা নাকি ছবি থেকে বাদ হয়ে গেছেন। হবেন নাই বা কেন? ঘরে বন্ধ থেকে প্রাণপণে
পাঠ মুখস্ত করা সত্ত্বেও এক নম্বর দৃশ্যে রামকৃষ্ণের কথার উত্তরে বিবেকানন্দের মুখ থেকে যদি তিন
নম্বর দৃশ্যের উত্তর বেরিয়ে পড়ে, তাহলে আর তাকে দিয়ে কিভাবে কাজ চলে? অর্থাৎ ফিল্ম অভিনেতা হিসেবেও তিনি যে
অপদার্থ সেটা সেজো কাকা প্রমাণ করে দিয়েছেন। আমার যখন ৪৮ বছর বয়স, শিকাগোতেই
আমার ছোট ভাইয়ের একটা চিঠিতে জানি, সেজো কাকা এক সাধু বাবার শিষ্য হয়ে
কোয়েম্বাটোর চলে গেছেন। গত বছর ডিসেম্বরের গোড়ায় আমার ছোট কাকার মেয়ে কাকলির
বিয়েতে আমাকে কলকাতায় আসতে হয়। সঙ্গে আমার স্ত্রী আর আমার দুই মেয়ে।
তারা দুজনেই পুরোপুরি আমেরিকায় মানুষ। ইতিমধ্যে সেজো কাকার কোন খবর পাইনি।
তাই কলকাতায় এসে যখন শুনলাম উনি শহরেই আছেন এবং বহাল তবিয়তে আছেন, তখন স্বভাবতই
তাকে একবার দেখার জন্য মনটা উৎসুক হয়ে উঠলো। আমার বয়স তখন ৬০। তাই সোজা হিসেবে
সেজো কাকার ৯০ আমি ধরেই নিয়েছিলাম। ইতিমধ্যেই প্রবাসেই কাকার দেহান্ত ঘটেছে শুনলাম ফার্ন রোডে তার ভাগ্নে অর্থাৎ আমার ছোট পিশিমার ছেলে ডাক্তার
রণেশ গুপ্তর বাড়িতে এসে তিনি উঠেছেন মাস তিনেক হলো। আরো শুনলাম ধর্মকর্ম ব্যাপারটা মোটেই
তার ধাঁতেশ হয়নি। ১০ বছরেও ইডলি দোষায় অভ্যাস হয়নি। রোজ আত পেটা খেয়ে ওজন নাকি প্রায় ৩০ কিলো কমে গেছে।
আমি এসেছি শুনে তিনি তার ডাক্তার ভাগ্নেকে বলেছেন, "ঝন্টুকে বলিস একবার যেন এসে আমার সঙ্গে দেখা করে।"
যায় এক রবিবার সন্ধ্যায় গিয়ে হাজির হলাম ফার্ন রোডে। লোডশেডিং চলছে। দোতলার একটি ঘরে টিমটিমে মোমবাতি জ্বালিয়ে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে খাটের উপর
বসে আছেন সেজো কাকা। একটা মটকার চাদরের উপর। গলায় প্যাঁচ দিয়ে জড়ানো সবুজ মাফলার।
কাকাকে দেখলে চেনা যায় বটেই এবং বলতেই হবে বয়সের পক্ষে রীতিমত মজবুত।
চেহারা। মাথার চুল সব পাকা ঠিকই কিন্তু এখনো যে চুল আছে সেটাই বড় কথা। আমায় দেখে হাসিতে মুখ ফাঁক হওয়াতে অরিজিনাল দাঁতও চোখে পড়লো। ডজন
খানিক আর যখন কথা বের হলো তখন দেখলাম গলার স্বর
হলেও কথায় বেশ তেজ আছে। এ তেজ কাকার মধ্যে আগে কখনো দেখিনি।
তিনি যে সকলের বয়স জ্যেষ্ঠ, তাকে আর কারোর কাছে মাথা নোয়াতে হয় না, এই বোধই হয়তো তার মেজাজে একটা ভারী কি ভাব এনে দিয়েছে। "কিরে ঝন্টু, মার্কিন মুলুকে গিয়ে কি করা হচ্ছে
শুনি?" আমার কাজের কথাটা যথাসম্ভব বিনয়ের সঙ্গে বললাম। "পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণা।" লোকে মান্যনি করে। আমার ৭৭ বছরের পিশিমা গলার সপ্তমে
চড়িয়ে আমার বিনয়কে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে জানিয়ে দিলেন আমার খ্যাতির কথা। "বটে!
নোবেল প্রাইজ পেয়েছিস কিনা সেটা বলা লাগে।" হালকা হেসে মাথা নাড়লাম।
"তবে আর কিসের বড়াই একেবারে
অপদার্থ! আমি এই গুতুর ঠেলা সামলাতে না সামলাতে সিজু কাকার বাক্যস্রোত আমাকে
নাকানি চোবানি খাইয়ে দিল। "তুই তো যা হোক ভিনমুলকে পালিয়ে
বাঁচলি। আমি ভাবলামুম কলকাতায় গিয়ে একটু স্বস্তি মিলবে। জীবনের শেষ কটা দিন তবু আপনজনের সান্নিধ্যে কাটবে। তা এসব কি হচ্ছে বলতে? শকুনির ঠোকরে তো হাড় মজারা বার করে
দিয়েছে। শহরটার দিনে ১০ ঘন্টা বিজলি নেই। শ্বাস টানলে ধোঁয়া ধুলোয় প্রাণ অতিষ্ঠ। জিনিসপত্রের যা দর, দরের স্বাদ মিটিয়ে ভালো মন্দ যে একটু খাবো তার জন্য দূর দূর দূর দূর। অপদার্থ অপদার্থ দূর।"
সেদিন বুঝলাম সেজো কাকার উপর থেকে আমার আমার পুরনো টানটা এখনো যায়নি। কারণ তার কথাগুলো শুনে আমার মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠলো।
মনে হলো আমরা বোধহয় একদিন ভুল করে এসেছি। উল্টো ভেবে এসেছি। আসলে কাকা দিব্য সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ। আমরা শুধু দুনিয়াটাই অপদার্থ। কিন্তু কথাটা যে ঠিক নয় সেটা সেজু কাকাই প্রমাণ করে দিলেন। কয়েকদিনের মধ্যে এক সকালে ছোট পিশিমা বাড়ি থেকে ফোন
এলো। সেজো কাকা ভোর রাত্রে ইহলোক ত্যাগ করে চলে গেছেন। আর যাওয়ার দিনটাও মোক্ষম বেঁচেছেন কাকা। কারণ সেইদিনই সন্ধ্যায় গোধূলি
লগ্নে আমার ভাগ্নির বিয়ে।
গল্পের শিক্ষা (Moral of the story)
গল্পের শিক্ষা হলো: মানুষকে শুধু “অপদার্থ” বা ছোট করে বিচার করা ঠিক না, কারণ প্রত্যেক মানুষের আলাদা ক্ষমতা, দুর্বলতা এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার একটা মূল্য থাকে। সমাজ অনেক সময় বাহ্যিক ব্যর্থতা দেখে মানুষকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করে, কিন্তু বাস্তবে সেই মানুষটার ভেতরে ভিন্ন দিক থাকতে পারে।
তাই কাউকে এক কথায় ছোট করে দেখা উচিত নয়, বরং তাকে বোঝার চেষ্টা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং তাকে বোঝানো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভূল হবে এটাই স্বাভাবিক। এই ভূল থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং সমৃদ্ধশালী জীবন গড়তে হবে। কেউ একদিনে বড় হয় না, একটু একটু করে বড় হয়।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url