দুই (সৎ ও লোভী) কাঠুরিয়া ও এক জলপরীর গল্প

গরীব দুই কাঠুরিয়া ও এক জলপরীর গল্প 

আজকের গল্পের মধ্যে মানুষের জীবনে সততা একটি মহৎ গুণ, আর লোভ ও মিথ্যা মানুষের পতনের অন্যতম কারণ। ‘দুই কাঠুরিয়া ও এক জলপরী’ গল্পে দুই কাঠুরিয়ার চরিত্রের মাধ্যমে সত্যবাদিতা ও লোভের ফলাফল সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সুতরাং গল্পটি মন দিয়ে পড়ুন। 
দুই (সৎ ও লোভী) কাঠুরিয়া ও এক জলপরী

গল্পের মধ্যে সৎ কাঠুরিয়া কাসেম সত্য কথা বলে পুরস্কৃত হয়, অন্যদিকে লোভী নরেন মিথ্যা বলে নিজের কুড়ালও হারায়। এই গল্পটি আমাদের সততার মূল্য এবং লোভের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় এবং লোভের পরিণতি কতটা ভয়াবহ তা অনুভব করতে সাহায্য করে। 

দুই (সৎ ও লোভী) কাঠুরিয়া ও এক জলপরীর গল্প

গরীব কাসেম ও নরেন পেশায় কাঠুরিয়া। প্রতিদিন দুই কাঠুরিয়া বনে গাছ কাটতে যেত। তাঁদের মধ্যে একজন কাসেম কাঠুরিয়া, সে আলীপুর গ্রাম বসবাস করত এবং দ্বিতীয় কাঠুরিয়া নরেন, সে নগেনপুর গ্ৰামে বসবাস করত।‌

যদিও তাঁরা দুইজন এক গ্ৰামে বসবাস করত না। তবুও তাঁরা প্রতিদিন একই পথ দিয়ে বনের ভিতর গাছ কাটতে যেত। অর্থাৎ, তাদের প্রতিদিন পথের মধ্যে কথাবার্তা আদান-প্রদান হতো।‌

একদিন কাসেম ও নরেন এক সাথে বিশ্বাস মোড়ল এর গাছ কাটার কাজ পেল। তাঁরা দুইজন খুব খুশি হল এবং রবিবার সকাল ৮ টায় দুইজন কাঠুরিয়া গাছ কাটতে শুরু করল। 

কিছুক্ষণ গাছ কাটার পর…..

নরেন বলল, বিশ্বাস মোড়ল তো এখন নেই, চলো কাসেম আমরা গাছ না কেটে চলে যায় এবং দ্বিতীয় দিন আবার আসবো এবং বিশ্বাস মোড়ল কে বলবো একদিনে মেহগুনি গাছ কাটতে পারিনি। দুই দিন সময় লেগে গেছে, আমাদের দুইদিনের মজুরি দিন। 

কাসেম বলল নরেন তুমি লোভে পড়ে মিথ্যা কথা বলো না। একদিন না একদিন এই মিথ্যা বলার ফল তুমি পাবে। একদিনের কাজ, দুইদিন সময় কেন নিব? আজকে গাছ কেটে শেষ করব। 

কাসেম এর কথায় রাজি হল এবং ভূল কাজ থেকে নরেন ফেরত এলো এবং তাঁরা দুইজন একদিনের মধ্যে মেহগনি গাছ কেটে শেষ করল। 

এভাবে তাঁরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ একসাথে করত এবং কাসেম এর সত্যতার কারণে নরেন ভূল পথ থেকে ফেরত আসতো। 

এভাবে কেটে গেল বহু বছর…..।

একদিন নরেন এর খুব জ্বর হল এবং সে বনে কাঠ কাটতে যেতে পারল না। 

কাসেম কাঠুরিয়া নদীর ধারে কুড়াল নিয়ে একাই বনে গেল এবং সেগুন গাছ, জারুল গাছ সহ বিভিন্ন ধরনের গাছ থেকে কাঠ সংগ্রহ করতে লাইল। 

সেগুন গাছ কাটার সময় হঠাৎ কাসেমের হাত থেকে লোহার কুড়াল নদীতে পড়ে গেল।‌ সে হতভম্ব হয়ে গেল এবং মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল এবং বলল আমি এখন কীভাবে নদীতে পড়ে যাওয়া কুড়াল উদ্ধার করব। নদীতে তো অনেক স্রোত। 

কিছুক্ষণ পর, কাসেম কাঠুরিয়া নদীর ধারের কাছে গেল এবং নদীর পানিতে হাত দিয়ে কাঁদতে লাললো। 

হঠাৎ, নদীর পানির ভিতর থেকে এক জলপরী বের হয়ে আসলো এবং বলল হে কাঠুরিয়া। তুমি নদীর ধারে এসে কাঁদছো কেন? 

কাসেম ভয়ে ভয়ে বলল, তুমি কে? 

জলপরী বলল, আমি জলপরী আমি এই খরোস্রোতা নদীতে বসবাস করি। এই নদীর মাঝনদীতে আমার ঘর। 

এখন বলো তুমি কাঁদছো কেন? 

কাসেম কাঠুরিয়া বলল, আমার লোহার কুড়াল নদীতে পড়ে গেছে। আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি কি আমার কুড়াল খুঁজে দেবে। কারণ, সেই কুড়াল দিয়ে আমি আমার সংসার চালায়। 

জলপরীর কাসেমের উপর দয়া হল এবং জলপরী বলল একটু অপেক্ষা করো। আমি নদীতে ডুব দিয়ে তোমার কুড়াল নিয়ে আনছি। 

কিছুক্ষণ পর, কাঠুরিয়া কাসেম কে একবার সোনার কুড়াল এবং একবার রুপার কুড়াল দেখালো। কিন্তু, কাসেম লোভ করল না।

কাসেম বলল জলপরী সোনার ও রুপার কুড়াল আমার নয়। আমার কুড়াল হল লোহার। 

তুমি নদীতে আবার ডুব দাও এবং আমার লোহার কুড়াল খুঁজে দাও। 

জলপরী গভীর নদীতে আবার ডুব দিল এবং কাসেম কাঠুরিয়ার জন্য একটি লোহার কুড়াল নিয়ে আনলো এবং বলল এই নাও তোমার লোহার কুড়াল। 

এরপর, কাসেম লোহার কুড়ালটি নিল এবং জলপরী কে ধন্যবাদ জানালো। 

জলপরী কাসেম কাঠুরিয়ার সততায় মুগ্ধ হয়ে তাকে পেছন থেকে ডাকলো এবং বলল হে কাঠুরিয়া তুমি একজন সত্যবাদী কাঠুরিয়া। আমি তোমাকে এই সোনার কুড়াল উপহার দিলাম।

কাসেম কাঠুরিয়া সোনার কুড়াল নিয়ে বাড়িতে গেল এবং সবাই কাসেম কাঠুরিয়ার সোনার কুড়াল এর কথা জেনে গেল এবং এক সময় নরেন কাঠুরিয়া ও জেনে গেল।

সোনার কুড়াল এর কথা শুনে নরেন কাঠুরিয়ার লোভ হয়ে গেল এবং সে কাসেম কাঠুরিয়ার বাড়ি গেল এবং কাসেম কে বলল, বন্ধু কাসেম তুমি কোথায় সোনার কুড়াল পেলে এবং কীভাবে পেলে। 

সহজ-সরল কাসেম কাঠুরিয়া তার বন্ধু নরেন কে তাঁর সোনার কুড়াল পাওয়ার ঘটনা জানিয়ে দিল এবং সব কথা শুনে নরেন কাঠুরিয়া কাসেম তার বাড়ি থেকে চলে গেল।‌

পরের দিন সকালে লোভী নরেন কাঠুরিয়া তাঁর লোহার কুড়াল নিয়ে বনে চলে এবং নরেন নদীর ধারে দেখতে পেল আগে থেকে অর্ধেক গাছ কাটা রয়েছে। সে বুঝে ফেলল এই গাছ কাসেম কয়েকদিন আগে কেটে গেছে। এই নদীতেই জলপরী আছে। 

সে কাসেমের কেটে রাখা গাছ কাটতে লাগলো এবং এক সময় নিজের ইচ্ছায় নিজের কুড়াল হাত থেকে নদীতে ফেলে দিল এবং মিথ্যা অভিনয় করতে শুরু করল। 

সে জোরে জোরে কাঁদতে লাললো।

তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনে আবার জলপরী নদী থেকে উপরে উঠে এলো জলপরী এবং বলল হে কাঠুরিয়া তোমার কি হয়েছে, তুমি কাঁদছো কেন? 

নরেন ভয় না পেয়ে জলপরী কে বলল, আমার কুড়াল নদীতে পড়ে গেছে। তুমি আমাকে আমার কুড়াল খুঁজে দাও। 

জলপরী নদীতে ডুব দিল এবং একটি সোনার কুড়াল নরেন কে দেখিয়ে বলল, এই কুড়ালটি কি তোমার? 

চকচকে সোনার কুড়াল দেখে মূহুর্তেই নরেন বলল, তোমার হাতে থাকা কুড়ালটি আমার? 

জলপরী বুঝে নিল নরেন মিথ্যা বলছে, এবং সে একজন অসৎ লোক। তাই, জলপরী নদীতে ডুব দিল এবং সে আর ফেরত এলো না।‌

নরেন কাঠুরিয়া সোনার কুড়াল ও পেল না, লোহার কুড়াল ও পেল না। তাই লোভী নরেন কাঠুরিয়া মাথায় হাত দিয়ে হায় হায় করতে লাগলো এবং সে বলল সোনার কুড়ালের আসায় নিজের পছন্দের লোহার কুড়াল হারালাম। 

গল্পের শিক্ষা (Moral of the story) 

বিখ্যাত রুপ কথার গল্প, কাঠুরিয়া ও জলপরীর গল্প থেকে আমরা শিখলাম, সততা ও সত্যবাদিতা মানুষের জীবনে সর্বদা সম্মান ও পুরস্কার বয়ে আনে। অন্যদিকে, লোভ ও মিথ্যার পরিণতি কখনো ভালো হয় না। তাই আমাদের সবসময় সত্য কথা বলতে হবে এবং লোভ পরিহার করতে হবে।

গল্পের মূলভাব

সততা ও সত্যবাদিতা মানুষের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনে, আর লোভ ও মিথ্যা মানুষকে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। তাই জীবনে সবসময় সৎ ও সত্যবাদী থাকা উচিত এবং বিপদে পড়তে না চাইলে মিথ্যা বলা বন্ধ করুন। 

দুই কাঠুরিয়া ও জলপরী গল্প থেকে প্রশ্ন ও উত্তর 

২০টি সাধারণ ছোট প্রশ্ন ও উত্তর 

১. প্রশ্ন: দুই কাঠুরিয়ার নাম কী ছিল?

উত্তর: দুই কাঠুরিয়ার নাম ছিল কাসেম ও নরেন।

২. প্রশ্ন: দুই কাঠুরিয়া কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করত?

উত্তর: তারা বনে গাছ কেটে কাঠ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ কর।

৩. প্রশ্ন: কে সত্য কথা বলেছিল?

উত্তর: কাসেম কাঠুরিয়া সত্য কথা বলেছিল।

৪. প্রশ্ন: কাসেমের কুড়াল কোথায় পড়ে গিয়েছিল?

উত্তর: কাসেমের লোহার কুড়াল নদীতে পড়ে গিয়েছিল।

৫. প্রশ্ন: কাসেম কেন নদীর ধারে কাঁদছিল?

উত্তর: তার লোহার কুড়াল নদীতে পড়ে যাওয়ায় সে কাঁদছিল।

৬. প্রশ্ন: নদী থেকে কে উঠে এসেছিল?

উত্তর: নদী থেকে একজন জলপরী উঠে এসেছিল।

৭. প্রশ্ন: জলপরী কোথায় বসবাস করত?

উত্তর: জলপরী নদীর মাঝখানে একটি ঘরে বসবাস করত।

৮. প্রশ্ন: জলপরী কাসেমকে প্রথমে কোন কুড়াল দেখিয়েছিল?

উত্তর: জলপরী প্রথমে কাসেমকে সোনার কুড়াল দেখিয়েছিল।

৯. প্রশ্ন: কাসেম সোনার কুড়াল দেখে কী বলেছিল?

উত্তর: কাসেম বলেছিল, সোনার কুড়ালটি তার নয়; তার কুড়ালটি লোহার।

১০. প্রশ্ন: কাসেম তার সততার জন্য কী পুরস্কার পেয়েছিল?

উত্তর: কাসেম তার লোহার কুড়ালের পাশাপাশি জলপরীর কাছ থেকে একটি সোনার কুড়াল পুরস্কার পেয়েছিল।

১১. প্রশ্ন: নরেন কেন নদীর ধারে গিয়েছিল?

উত্তর: সোনার কুড়াল পাওয়ার লোভে নরেন নদীর ধারে গিয়েছিল।

১২. প্রশ্ন: নরেন কীভাবে নিজের কুড়াল নদীতে ফেলেছিল?

উত্তর: নরেন ইচ্ছা করে নিজের লোহার কুড়াল নদীতে ফেলে দিয়েছিল।

১৩. প্রশ্ন: নরেন নদীর ধারে কী করছিল?

উত্তর: নরেন জোরে জোরে কাঁদার অভিনয় করছিল।

১৪. প্রশ্ন: জলপরী নরেনকে কোন কুড়াল দেখিয়েছিল?

উত্তর: জলপরী নরেনকে একটি লোহার কুড়াল দেখিয়েছিল।

১৫. প্রশ্ন: নরেন কেন মিথ্যা বলেছিল?

উত্তর: সোনার কুড়াল পাওয়ার লোভে নরেন মিথ্যা বলেছিল।

১৬. প্রশ্ন: নরেনকে জলপরী কেন পুরস্কার দেয়নি?

উত্তর: নরেন অসৎ হয়ে মিথ্যা বলেছিল এবং লোভ করেছিল, তাই জলপরী তাকে কোনো পুরস্কার দেয়নি।

১৭. প্রশ্ন: লোভী নরেনের কী পরিণতি হয়েছিল?

উত্তর: নরেন নিজের লোহার কুড়ালও হারিয়েছিল এবং সোনার কুড়ালও পায়নি।

১৮. প্রশ্ন: নরেন কেন নিজের পছন্দের কুড়াল হারিয়েছিল?

উত্তর: সোনার কুড়াল পাওয়ার লোভে মিথ্যা বলার কারণে সে নিজের লোহার কুড়ালও হারিয়েছিল।

১৯. প্রশ্ন: গল্পটির মূল শিক্ষা কী?

উত্তর: এই গল্পের মূল শিক্ষা হলো—লোভ ও মিথ্যার পরিণতি খারাপ, আর সততা ও সত্যবাদিতার ফল সবসময় ভালো।

২০. প্রশ্ন: দুই কাঠুরিয়া ও জলপরীর গল্প থেকে আমরা কী শিখলাম?

উত্তর: এই গল্প থেকে আমরা শিখলাম, জীবনে সবসময় সত্য ও সৎ পথে চলতে হবে। লোভ করে মিথ্যা বললে নিজের যা আছে তাও হারাতে হতে পারে, কিন্তু সততার জন্য সম্মান ও পুরস্কার পাওয়া যায়।

আরো গল্প পড়ুন,




এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url