আলীবাবা ও চল্লিশ চোর গল্প - রহস্যময় গুপ্তধনের গল্প

সৎ আলীবাবা ও চল্লিশ ডাকাতের গল্প 

লোককাহিনির জগতে "আলীবাবা ও ৪০ চোর" একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও রোমাঞ্চকর গল্প। এটি শুধু ধন-সম্পদ ও গুপ্তধনের গল্প নয়, বরং বুদ্ধি, সততা, সাহস এবং লোভের পরিণতির এক চমৎকার উপাখ্যান।

গল্পে দেখা যায়, দরিদ্র কাঠুরে আলীবাবা আকস্মিকভাবে এক গুপ্তধনের সন্ধান পায়, যা চল্লিশ জন ডাকাতের গোপন আস্তানায় লুকিয়ে রাখা ছিল। এরপর শুরু হয় নানা রোমাঞ্চকর ঘটনা, বিপদ, ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধির লড়াই। বিশেষ করে মর্জিনার উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহস গল্পটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। 
আলীবাবা ও চল্লিশ চোর গল্প - রহস্যময় গুপ্তধনের গল্প

শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের কাছে এই গল্পটি সমানভাবে উপভোগ্য। একই সঙ্গে এটি আমাদের শেখায় যে সততা ও প্রজ্ঞা মানুষকে সাফল্যের পথে নিয়ে যায়, আর লোভ শেষ পর্যন্ত সর্বনাশ ডেকে আনে।

আলীবাবা ও চল্লিশ চোর

অনেক দিন আগের কথা। এক দেশে আলীবাবা নামে এক দরিদ্র কিন্তু সৎ কাঠুরে বাস করত। তার বড় ভাই কাসিম ছিল ধনী ব্যবসায়ী। কাসিম ধনী পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেছিল বলে তার জীবনে কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু আলীবাবা খুব কষ্ট করে দিন কাটাত। প্রতিদিন সে তিনটি গাধা নিয়ে জঙ্গলে কাঠ কাটতে যেত এবং সেই কাঠ বিক্রি করে সংসার চালাত।

একদিন আলীবাবা জঙ্গলে কাঠ কাটছিল। হঠাৎ দূরে ধুলোর মেঘ দেখতে পেল। সে ভয় পেয়ে দ্রুত একটি বড় গাছের উপরে উঠে লুকিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর সে দেখল চল্লিশজন সশস্ত্র ডাকাত ঘোড়ায় চড়ে সেখানে এসে থামল। ডাকাতদের সর্দার একটি পাহাড়ের গুহার সামনে গিয়ে উচ্চস্বরে বলল,

— “চিচিং ফাঁক!”

সঙ্গে সঙ্গে গুহার দরজা খুলে গেল। ডাকাতরা ভেতরে ঢুকে তাদের লুট করা ধন-সম্পদ রেখে আবার বেরিয়ে এল। বের হওয়ার সময় সর্দার বলল,

— “চিচিং বন্ধ!”

সঙ্গে সঙ্গে গুহার দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল।

ডাকাতরা চলে যাওয়ার পর আলীবাবা গাছ থেকে নেমে এল। তার মনে প্রবল কৌতূহল জাগল। সে গুহার সামনে গিয়ে সাহস করে বলল,

— “চিচিং ফাঁক!”

অবাক হয়ে সে দেখল, গুহার দরজা সত্যিই খুলে গেছে। ভেতরে ঢুকে সে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। গুহাটি সোনা, রূপা, হীরা, মুক্তা ও অসংখ্য মোহরে ভরা। আলীবাবা বুঝতে পারল, ডাকাতরা তাদের লুট করা সমস্ত ধন-সম্পদ এখানে জমা করে রাখে।

সে মনে মনে ভাবল, এত সম্পদের মধ্যে থেকে সামান্য কিছু নিলে অন্যায় হবে না। তাই সে তার তিনটি গাধার পিঠে যতটুকু বহন করা যায় ততটুকু মোহর নিয়ে বাড়ি ফিরে এল।

বাড়িতে এসে সে তার স্ত্রীকে সব ঘটনা খুলে বলল। স্ত্রী প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিল না। পরে মোহরগুলো দেখে সে বিস্মিত হয়ে গেল। তারা মোহরগুলো গুনতে চাইল, কিন্তু সংখ্যা এত বেশি ছিল যে গুনে শেষ করা সম্ভব হলো না। তাই তারা ওজন করার জন্য কাসিমের বাড়ি থেকে একটি দাঁড়িপাল্লা ধার করে আনল।

কিন্তু কাসিমের স্ত্রী খুব কৌতূহলী ছিল। সে দাঁড়িপাল্লার নিচে গোপনে আঠা লাগিয়ে দিল। যখন আলীবাবার স্ত্রী দাঁড়িপাল্লা ফেরত দিল, তখন একটি সোনার মোহর আঠার সঙ্গে লেগে রইল।

মোহরটি দেখে কাসিমের স্ত্রী বিস্মিত হয়ে গেল। সে দ্রুত স্বামীকে খবর দিল। কাসিমও অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, তার দরিদ্র ভাইয়ের ঘরে এত সোনা এল কোথা থেকে?

পরদিন কাসিম আলীবাবার কাছে গিয়ে রহস্য জানার জন্য চাপ দিতে লাগল। শেষ পর্যন্ত আলীবাবা সব ঘটনা খুলে বলল এবং তাকে সাবধান করল যে ডাকাতরা খুব ভয়ংকর।

কিন্তু কাসিম ছিল অত্যন্ত লোভী। পরদিন ভোরে সে দশটি গাধা নিয়ে জঙ্গলের সেই গুহার কাছে গেল। গুহার সামনে দাঁড়িয়ে সে বলল,

— “চিচিং ফাঁক!”

দরজা খুলে গেল এবং সে ভেতরে ঢুকে পড়ল। গুহার ভেতরের বিপুল ধন-সম্পদ দেখে সে লোভে অন্ধ হয়ে গেল। যতটা সম্ভব সোনা ও রত্ন গাধাগুলোর জন্য জমা করতে লাগল।

কিন্তু যখন বের হওয়ার সময় এল, তখন সে গুহার দরজা খোলার মন্ত্র ভুলে গেল। ভয়ে তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল। সে নানা রকম শব্দ বলল, কিন্তু কোনো কাজ হলো না।

এদিকে ডাকাতরা ফিরে এসে তাকে গুহার ভেতরে দেখতে পেল। তারা বুঝে গেল, কেউ তাদের গোপন আস্তানার খবর জেনে গেছে। ক্রোধে তারা কাসিমকে হত্যা করল এবং তার দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলল।

কাসিম বাড়ি না ফেরায় সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। আলীবাবা জঙ্গলে গিয়ে খোঁজ করতে লাগল। গুহার ভেতরে ঢুকে সে ভাইয়ের খণ্ড-বিখণ্ড দেহ দেখতে পেল। শোকে তার হৃদয় ভেঙে গেল।

সে গোপনে দেহের টুকরোগুলো বাড়িতে নিয়ে এল। তারপর মোস্তফা নামে এক দক্ষ মুচিকে ডেকে এনে দেহটি এমনভাবে সেলাই করাল যে কেউ কিছু বুঝতে না পারে। পরে কাসিমকে যথাযথভাবে দাফন করা হলো।

এদিকে ডাকাত সর্দার বুঝতে পারল, কাসিমের দেহ কেউ গুহা থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। অর্থাৎ তাদের গোপন আস্তানার খবর আরেকজন জানে। তাই সে ছদ্মবেশে শহরে এসে অনুসন্ধান শুরু করল।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর সে মোস্তফা মুচির কাছ থেকে কৌশলে আলীবাবার বাড়ির সন্ধান পেয়ে গেল। তারপর একটি নতুন পরিকল্পনা করল।

সর্দার উনচল্লিশজন ডাকাতকে বড় বড় তেলের জ্বালার ভেতরে লুকিয়ে রাখল। একটি জ্বালায় শুধু তেল ভরা ছিল। তারপর সে নিজে তেল ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশ ধারণ করে আলীবাবার বাড়িতে আশ্রয় চাইল।

অতিথিপরায়ণ আলীবাবা তাকে সাদরে গ্রহণ করলেন।

সেই বাড়িতে মর্জিনা নামে এক বুদ্ধিমতী দাসী ছিল। রাতে রান্নার কাজ করতে গিয়ে সে তেলের অভাব অনুভব করল। তাই অতিথির জ্বালা থেকে কিছু তেল নেওয়ার জন্য বাইরে গেল।

হঠাৎ সে একটি জ্বালার ভেতর থেকে ফিসফিস শব্দ শুনতে পেল—

— “সর্দার, বের হবো কখন?”

মর্জিনা সঙ্গে সঙ্গে সব বুঝে গেল। সে বুঝল, জ্বালার ভেতরে ডাকাতরা লুকিয়ে আছে।

অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি দেখিয়ে সে বড় কড়াইয়ে তেল গরম করল এবং একে একে সব জ্বালার ভেতরে ঢেলে দিল। ফলে সব ডাকাত মারা গেল। শুধু সর্দার পালিয়ে বাঁচল।

পরদিন আলীবাবা সব ঘটনা জানতে পেরে মর্জিনার বুদ্ধি ও সাহসের প্রশংসা করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, মর্জিনা তাদের প্রাণ বাঁচিয়েছে।

কিছুদিন পরে ডাকাত সর্দার আবার নতুন ছদ্মবেশে শহরে ফিরে এল। এবার সে একজন ধনী সওদাগর সেজে আলীবাবার ছেলে কাসেমের সঙ্গে বন্ধুত্ব করল। তার উদ্দেশ্য ছিল সুযোগ পেয়ে প্রতিশোধ নেওয়া।

কিন্তু মর্জিনা তার আচরণ দেখে সন্দেহ করল। একদিন সওদাগরের বাড়িতে এক অনুষ্ঠানের সময় মর্জিনা নর্তকীর ছদ্মবেশে সেখানে উপস্থিত হলো। সে নিশ্চিত হয়ে গেল যে এই সওদাগরই আসলে সেই ডাকাত সর্দার।

সুযোগ বুঝে মর্জিনা তার খঞ্জর দিয়ে ডাকাত সর্দারকে হত্যা করল।

এভাবে তৃতীয়বারের মতো মর্জিনা আলীবাবার পরিবারকে রক্ষা করল।

আলীবাবা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তিনি মর্জিনাকে নিজের মেয়ের মর্যাদা দিলেন এবং তার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলেন।

এরপর আলীবাবা সুখে-শান্তিতে জীবন কাটাতে লাগলেন। তিনি তার সম্পদের একটি বড় অংশ দরিদ্র মানুষদের সাহায্যে ব্যয় করলেন। আর মর্জিনা ও তার স্বামীও সুখে সংসার করতে লাগল।

শিক্ষণীয় বিষয়

লোভ মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনে, যেমন কাসিমের ক্ষেত্রে হয়েছিল। অন্যদিকে বুদ্ধি, সাহস, সততা ও উপস্থিত বুদ্ধি মানুষকে বড় বিপদ থেকেও রক্ষা করতে পারে। মর্জিনার প্রজ্ঞা ও সাহসই আলীবাবার পরিবারকে বারবার বাঁচিয়েছিল।

আরো গল্প পড়ুন,




এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url