শিয়াল ও ছাগলের শিক্ষনীয় গল্প
চালাক শিয়াল ও বোকা ছাগলের গল্প
মানুষের জীবনে যেমন সততা, বুদ্ধিমত্তা ও সচেতনতার গুরুত্ব অপরিসীম, তেমনি প্রাণীদের গল্পের মধ্যেও এসব মূল্যবান শিক্ষা লুকিয়ে থাকে। “একটি শিয়াল এবং একটি ছাগলের গল্প” এমনই একটি শিক্ষণীয় গল্প, যেখানে ধূর্ত শিয়ালের কৌশল, সরল ছাগলের বিশ্বাস এবং সিংহের হিংস্রতার মাধ্যমে প্রতারণার ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে।
গল্পটি আমাদের শেখায় যে, অন্ধভাবে অন্যের কথায় বিশ্বাস করা বিপদের কারণ হতে পারে এবং প্রতারণার ফাঁদে পা দিলে তার ফল ভোগ করতেই হয়। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের জন্য এটি একটি উপদেশমূলক ও নীতিশিক্ষামূলক গল্প হতে যাচ্ছে।
শিয়াল ও ছাগলের গল্প
একদিন এক চালাক শিয়াল শিকারের খোঁজে গর্ত থেকে বেরিয়ে এল। খানিক পর তার কানে এলো এক বনমোরগের ডাক। ডাক অনুসরণ করে সে পৌঁছে গেল বনের ধারে। বনমোরগ ধরার নেশায় ঝোপঝাড় ও লতাপাতার ফাঁকফোঁকর দিয়ে এগুতে লাগল ধূর্ত শিয়াল। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল, একটি গাছের আড়াল থেকে মচমচে শব্দ আসছে। সতর্কতার সাথে এগিয়ে যেতেই দেখল বিরাট একটা হাতি গাছপালার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আর ঘটনাক্রমে একই পথে উল্টো দিক থেকে আসছে একটা সিংহ।
বিশাল হাতি আর হিংস্র সিংহ মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। পথটি এত সরু যে, কেউ কাউকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারছে না। গর্জন করে সিংহ বলল, “আমার সামনে থেকে সরে দাঁড়া। আমি পার হব।”
সিংহের নির্দেশ শুনে হাতি গেল ক্ষেপে। সে বলল, “তুই সরে দাঁড়া! আর তাতে রাজি না হলে আমার হাত-পায়ের নিচ দিয়ে পার হ।”
সিংহ বলল, “কি বললি, আমি তোর হাত-পায়ের নিচ দিয়ে পার হব? তুই কি জানস না আমি হচ্ছি পশুদের রাজা সিংহ?”
বিশাল দেহী হাতি বলল, “আরে, তুই পশুরাজ হলি কিভাবে? আমি হচ্ছি হাতি, সবার বড়। আমাকে সম্মান জানানো তোর উচিত।”
গর্জন করে সিংহ বলল, “গর্দান বড় হলেই কেউ বড় হয় না রে! তুই তো নিজের সম্মানই রক্ষা করতে পারিস না। তুই যদি বড় আর মান-সম্মানের পাত্রই হতিস, তাহলে তোকে কেউ কেন ভয় পায় না ও সম্মান করে না। শুনে রাখ—মান-সম্মান বলতে যা কিছু আছে তা কেবল আমারই। দেখিস না, এই বনের সবাই আমাকে কেমন ভয় করে চলে?”
রেগে গিয়ে হাতি বলল, “যারা ভয় করে করুক। কিন্তু আমি তোকে ভয় করি না। তোকে উপরে তুলে এমন এক আছাড় মারব যে, তোর হাড়গোড় একেবারে ভেঙে যাবে।”
সিংহ বলল, “তুই আমাকে আছাড় মারবি আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব? আমি তোর শুঁড়ে এমন এক থাবা মারব যে, মাটিতে গড়াগড়ি খাবি আর ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে চিৎকার করবি।”
এ কথা শুনে হাতির গায়ে আগুন ধরে গেল। চোখের পলকে হাতি তার শুঁড় দিয়ে সিংহের পেট ও পিঠ পেঁচিয়ে ধরল। এরপর মাটি থেকে বহু উপরে তুলে মোটাসোটা গাছের দিকে প্রবল জোরে ছুঁড়ে মারল সিংহকে। তারপর নিজের পথ ধরে এগিয়ে গেল হাতিটি। সিংহ উড়ে গিয়ে পড়ল গাছপালার উপর। তার মাথা গিয়ে পড়ল একটা বিশাল মেহগনি গাছের গোড়ায়।
“মাগো!” বলে চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ল সিংহ। শিয়াল গাছের আড়ালে বসে নীরবে এ ঘটনা দেখছিল। কিছুক্ষণ পর সিংহের হুঁশ ফিরে এলো। কোনোমতে নিজেকে গাছপালার ফাঁক থেকে বের করে আনল এবং বাইরে রোদে এসে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল।
এ সময় শিয়াল সিংহের সামনে গিয়ে সালাম দিল। তারপর বলল, “আমি দূর থেকে দেখলাম আপনি এখানে শুয়ে আছেন। ভাবলাম মহারাজ বোধহয় অসুস্থ। তাই আপনার খেদমতে ছুটে এলাম।”
সিংহ বলল, “তুই ঠিকই ধরেছিস। কিছুদিন যাবত শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। তাই শিকারও করতে পারছি না। কিন্তু তোকে তো চিনতে পারলাম না। তোর বাবার নাম কি?”
শিয়াল বলল, “মহারাজ! আমি এই জঙ্গলেই থাকি। আমার বাবার নাম থালাব। আমাদের বংশ আপনার পরিবারের খাদেম ছিল। আমরা তো আপনাদের শিকার করা পশুর উচ্ছিষ্ট খেয়েই বেঁচে আছি হুজুর!”
সিংহ বলল, “হ্যাঁ, তোর বাবাকে চিনতাম। সে আমাদের খুব খেদমত করত। আজ তোকে একটা কাজ দিতে চাই, পারবি তো কাজটি করতে?”
শিয়াল বলল, “এই গোলাম আপনার খেদমত করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবে। বলুন কি করতে পারি আপনার জন্য?”
সিংহ বলল, “তুই তো দেখতেই পাচ্ছিস আমার শরীরটা বেশি ভালো না। তুমি যদি বুদ্ধি করে কোনো পশুকে এখানে আনতে পারিস তাহলে পেটে কিছু দানাপানি পড়ত। তুই ভাবিসনে যে, তোকে রেখেই আমি একা একা খাব। দু’জন মিলে মজা করে খেতাম আর কী!”
তারপর শিয়াল সোজা চলে গেল মেষ ও ছাগলপালের কাছে। সেখানে গিয়ে দেখতে পেল একটি ছাগল পাল থেকে অনেক পেছনে পড়ে আছে। তখন সে সুযোগ বুঝে ছাগলের কাছে গেল। কৌশলী শিয়াল কিছু লতাপাতা মুখে পুরে তিরিং-বিরিং লাফানো শুরু করল। ছাগল দূর থেকে শিয়ালের খেলা দেখে সেদিকে মনোযোগ দিল। খেলা দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই শিয়ালের কাছে এসে হাসতে লাগল নির্বোধ ছাগলটি। এরপর হাসি একটু থামিয়ে শিয়ালকে বলল,
“তোমার মনে আজ অনেক ফুর্তি তাই না শিয়াল ভায়া?”
শিয়াল বলল, “ফুর্তি থাকবে না কেন? আমি তোর মত মাঠে পড়ে থাকি? আমার যখন যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাই। খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা আর মনে আনন্দে ঘুরে বেড়ানোই তো আমার কাজ।”
ছাগল বলল, “খেলাধুলা ভালো। তবে জীবনটা তো শুধু খেলাধুলার জন্য নয়। বেঁচে থাকতে হলে, কাজ-কর্ম, বিপদ-আপদ এমনকি সিংহ, বাঘ, ভল্লুক এসব দুশমনের কথাও ভাবতে হবে।”
বিচক্ষণ শিয়াল বলল, “কি যে বলিস তুই! এসব একদম বাজে কথা। বাঘ-ভল্লুক, এরা আবার কোন জানোয়ার? তুই কোনদিন নিজ চোখে এদেরকে দেখেছিস?”
ছাগল বলল, “আমি দেখি নাই। তবে শুনেছি ওরা খুব ভয়ংকর প্রাণী।”
চতুর শিয়াল বলল, “একদম বাজে কথা। ওরা মোটেই ভয়ংকর প্রাণী না। এই আজই তো আমি এক সিংহের সঙ্গে খেলা করে এলাম। তার কান ধরে কামড় দিলাম। লেজ ধরে টানলাম। কই, আমাকে তো কামড় দিল না! তুই বিশ্বাস না করলে আমার সঙ্গে চল। তুইও সিংহের সঙ্গে খেলা করতে পারবি।”
শিয়ালের কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিল না ছাগলটি। তারপরও মনে কৌতূহল জাগল সিংহকে এক নজর দেখার। শিয়ালও ছাগলকে এই বলে লোভ দেখাল যে, সিংহকে এক নজর দেখা মানে নিজেকে ধন্য করা। এর মাধ্যমে ছাগলের সম্মানও অনেক বেড়ে যাবে।
শিয়ালের চালাকি বুঝতে না পেরে সিংহকে দেখার ভয়ংকর সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলল আহাম্মক ছাগল। বনের ভেতর গিয়ে ছাগল যেই সিংহকে দেখল অমনি ভয়ে তার আত্মা শুকিয়ে গেল। সেখানেই থেমে গিয়ে ছাগলটি বলল, “শিয়াল ভাইয়া, আমার ভীষণ ভয় করছে। আমি আর সামনে যাব না। আজ যদি কোন বিপদ আসে তাহলে সবাই আমাকেই দোষারোপ করবে। আর সিংহটি যদি অসুস্থই হয় তাহলে একটা অসুস্থ প্রাণীকে কষ্ট দেয়া মোটেই উচিত হবে না।”
শেষ পর্যায়ে এসে ছাগলকে বাগে আনা যাচ্ছে না দেখে শিয়াল খুব চিন্তায় পড়ে গেল। কিন্তু হতাশ না হয়ে আবার ছাগলকে ধোঁকা দেয়া শুরু করল। শিয়াল বলল, “তুই মিছেমিছি ভয় পাচ্ছিস। একটা অসুস্থ প্রাণী আমাদের কিছুই করতে পারবে না। তারপরও তুই যদি আমার সঙ্গে যেতে না চাস তাহলে এখানেই দাঁড়িয়ে থাক। আমি গিয়ে সিংহের সঙ্গে খেলা করে আসি। যদি দেখিস সিংহ আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে তাহলে আমি ‘হুক্কাহুয়া’ ডাক দেয়ার সাথে সাথেই চলে আসিস।”
প্রতারক শিয়াল এ কথা বলে এগিয়ে গেল সিংহের কাছে। কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“মহারাজ! খুব সাবধানে থাকবেন। আমি বহু ছলচাতুরি করে একটা ছাগলকে সাথে নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে আসতে চাচ্ছে না। আমি এখন আপনার সাথে কিছু খেলতামাশা করব। আর আপনি ঘুমের ভান করে পড়ে থাকবেন। তাহলে দেখবেন অবুঝ ছাগলও এক্ষুণি এখানে চলে আসছে।”
ছাগলের গোশত খাওয়ার লোভে বনের রাজা সিংহ শিয়ালের এ অন্যায় প্রস্তাবও মেনে নিল। শিয়াল এ সময় সিংহের লেজ ও কান ধরে টানাটানি করতে লাগল। তারপর সিংহের ওপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এদিক-ওদিক যেতে লাগল। দূর থেকে সহজ-সরল ছাগল এসব দেখে খুব মজা পেল।
এ সময় শিয়াল “হুক্কাহুয়া” ডাক দিতেই হাবাগোবা ছাগলটি ছুটে গেল সিংহের কাছে। বুদ্ধিহীন ছাগল বলল, “আমিও সিংহের কানের কাছে ভ্যা ভ্যা করব, কানে সুড়সুড়ি দেবো এবং লেজে কামড় দেবো।”
শিয়াল বলল, “তোর যা মনে চায় তাই কর। এমন সুযোগ তো আর পাবিনে।”
বোকা ছাগল তখন খুশিতে এগিয়ে গেল সিংহের কাছে। কানে ভ্যা করে চিৎকার দিতেই সিংহ এক ঝটকায় ছাগলকে দুই থাবা দিয়ে ধরে ফেলল। এরপর সিংহ বলল,
“এই পুচকে বোকা ছাগল! লাজ-শরমের মাথা খেয়েছিস নাকি! বেয়াদব-বেহায়া ছোটলোক কোথাকার! তুই যে অন্যায় করেছিস তাতে তোকে আমি খেয়ে ফেলবো।
সিংহের ধমক খেয়ে ছাগল কান্নাকাটি শুরু করে দিল। এখানে ডেকে আনা এবং বেয়াদবি করতে উৎসাহ দেয়ার জন্য শিয়ালকে দোষারোপ করতে লাগল। কিন্তু সিংহ কোনো কথাই শুনল না। সে হুংকার দিয়ে বলল,
“তোর কোন মাফ নাই। তোর আক্কেল-বুদ্ধি থাকলে দলবল ছেড়ে শিয়ালের কথায় আমার সাথে খেল-তামাশা জুড়ে দিতি না। তুই ইচ্ছা না করলে শিয়াল তোকে কখনোই আমার কাছে আনতে পারতো না। তোর অপরাধের শাস্তি তোকে ভোগ করতেই হবে।”
এই বলে ক্ষুধার্ত সিংহটি ছাগলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ছাগল বুঝতে পারল, শিয়ালের ধোঁকা আর নিজের বোকামীর কারণেই তাকে সিংহের খাবার হতে হচ্ছে।
গল্পের নীতিকথা (Moral of the Story)
প্রতারণা করা যেমন অন্যায়, তেমনি না বুঝে অন্যের কথায় বিশ্বাস করাও বিপদের কারণ হতে পারে। তাই সব সময় সত্যবাদী হতে হবে, বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং ধোঁকাবাজ মানুষের ফাঁদ থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
আরো গল্প পড়ুন,

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url