মুহাম্মদ (সা) এর উপর প্রথম ওহী নাজিলের ঘটনা (হাদিসের গল্প ১)
হেরা গুহায় কুরআনের প্রথম সূরা নাজিলের ঘটনা
উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশা (রাঃ) হতে ওহী নাজিলের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটি সহিহ বুখারী (৩৩৯২, ৪৯৫৩, ৪৯৫৫, ৪৯৫৬, ৪৯৫৭, ৬৯৮২; মুসলিম ১/৭৩ হাঃ ১৬০, আহমাদ ২৬০১৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৩) বর্ণিত রয়েছে।
মহানবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর প্রথম ওহী অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনাটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল, যা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে প্রথম বানী।
আজ আমরা জানব কীভাবে হেরা গুহা-এ মহানবী (ﷺ)-এর কাছে প্রথম ওহী নাজিল হয়েছিল এবং কীভাবে তিনি নবুওয়তের মহান দায়িত্ব লাভ করেছিলেন।
নবুওয়ত লাভের আগে মহানবী (ﷺ) কি করতেন?
নবুওয়ত লাভের আগে মহানবী (ﷺ) ছিলেন সত্যবাদী, সৎ ও বিশ্বস্ত মানুষ। মক্কার লোকেরা আমাদের নবী (ﷺ) কে "আল-আমিন" বা বিশ্বাসী ব্যক্তি বলে ডাকত। সবাই তাঁকে বিশ্বাস করত।
সবাই তাঁকে বিশ্বাস করত। কিন্তু, তখনো মক্কা-র অনেক মানুষ মূর্তিপূজা করত। তাদের নানা অন্যায় কাজ দেখে মহানবী (ﷺ) কষ্ট পেতেন এবং এই অন্যায়, অশ্লীলতা, বেহায়া পনা থেকে তিনি সব সময় মুক্তি পেতে চাইতেন। তাই, তিনি মক্কার কোলাহল ছেড়ে পাহাড়ের উপরে অবস্থিত হেরা গুহায় একাকী ধ্যান মগ্ন থাকতেন।
মুহাম্মদ (সা) এর উপর প্রথম ওহী নাজিলের ঘটনা - হেরা গুহার ঘটনা
একদিন, যখন মহানবী (ﷺ) হেরা গুহায় অবস্থান করছিলেন, তখন হঠাৎ এক মহান ফেরেশতা তাঁর সামনে উপস্থিত হলেন। তিনি, চমকে উঠলেন।
ফেরেশতা জিবরাইল (আ) বললেন,"ইকরা" - অর্থাৎ "পড়ুন"। মহানবী (ﷺ) উত্তর দিলেন, "আমি তো পড়তে জানি না।"
তখন জিবরাইল (আ.) তাঁকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরলেন এবং ছেড়ে দিলেন এবং আবার বললেন,
"পড়ুন।"
এভাবে জিবরাইল (আ.) আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (ﷺ) কে তিনবার জড়িয়ে ধরলেন এবং ছেড়ে দিলেন। এরপর, ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহীর আয়াতগুলো পাঠ করে শোনালেন।
প্রথম নাজিল হওয়া কুরআনের আয়াত। ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) বললেন: "পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।
যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তপিণ্ড থেকে।
পড়ুন, আর আপনার রব সবচেয়ে সম্মানিত।"
এই আয়াতগুলো আল-কুরআন-এর সূরা আলাক-এর প্রথম কয়েকটি আয়াত। সূরা আলাক ৯৬/১-৩)
এগুলোই ছিল মানবজাতির জন্য নাজিল হওয়া ইসলামের প্রথম ওহী, যা মক্কায় অবস্থিত হেরা গুহায় অবতীর্ণ হয়।
এরপর, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভয় পেয়ে যান এবং তিনি দ্রুত হেরা গুহা থেকে নিজের ঘরে ফিরে যানএবং তাঁর প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে বললেন,
"আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও।" খাদিজা (রা.) তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন এবং শান্ত করলেন।
এরপর, খাদিজা (রা.) বললেন, "কী হয়েছে আমার প্রাণের স্বামী। আমাকে পুরো ঘটনা খুলে বলুন।
মহানবী (ﷺ) যখন পুরো ঘটনাটি বললেন, তখন খাদিজা (রা.) তাঁকে সাহস দিলেন।
তিনি বললেন, "আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমান করবেন না। আপনি আত্মীয়দের সাহায্য করেন, গরিবদের পাশে দাঁড়ান, অতিথিদের সম্মান করেন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করেন।"
খাদিজা (রা.)-এর এই কথাগুলো মহানবী (ﷺ)-এর মনে শান্তি এনে দিল। কিন্তু, খাদিজা (রা.) মনে তখনো সন্দেহ যায়নি।
বেশ কিছুদিন পর, খাদিজা (রা.) মহানবী (ﷺ)-কে তাঁর জ্ঞানী চাচাতো ভাই ওয়ারাকাহ ইবন নাওফাল-এর কাছে নিয়ে গেলেন।
খাদিজা (রা.) ও মুহাম্মদ (সা.) দুজনেই সব কথা খুলে বললেন। সব কথা শোনার পর ওয়ারাকাহ ইবন নাওফাল বললেন, "এ সেই ফেরেশতা, যাকে আল্লাহ পূর্বে মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর কাছেও পাঠিয়েছিলেন।"
তিনি আরও বললেন যে, ভবিষ্যতে মানুষ নবীজির বিরোধিতা করবে। তবে, আমি জীবিত থাকলে নবীজিকে সাহায্য করব।
এরপর, দীর্ঘদিন ওহী আসা বন্ধ ছিল। এভাবে, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এর কাছ থেকে ওহী পান। এভাবে, ওহীর যাত্রা চলতে থাকে।
হাদিসের এই গল্প থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই?
- ১. সত্যের সন্ধান করলে আল্লাহ পথ দেখান।
- ২. জ্ঞান অর্জন ইসলামের প্রথম নির্দেশ।
- ৩. কঠিন সময়ে পরিবারের সমর্থন খুব গুরুত্বপূর্ণ।
- ৪. ভালো কাজ মানুষকে সম্মানিত করে।
- ৫. আল্লাহর ওপর ভরসা করলে ভয় দূর হয়।
- ৬. ধৈর্য ও সাহস সফলতার চাবিকাঠি।
- ৭. সৎ মানুষের জন্য আল্লাহ
- ৮. শিক্ষা ও জ্ঞান মানুষের মর্যাদা বাড়ায়।
মুহাম্মদ (সা) এর উপর প্রথম ওহী নাজিলের ঘটনা থেকে কিছু প্রশ্ন ও উত্তর
১০টি ছোট প্রশ্ন ও উত্তর
১. মহানবী (ﷺ)-এর কাছে প্রথম ওহী কোথায় নাজিল হয়েছিল?
উঃ হেরা গুহায়।
২. প্রথম ওহী নিয়ে কোন ফেরেশতা এসেছিলেন?
উঃ জিবরাইল (আ.)।
৩. ফেরেশতা প্রথম কী বলেছিলেন?
উঃ "পড়ুন"।
৪. প্রথম নাজিল হওয়া সূরার নাম কী?
উঃ সূরা আলাক।
৫. নবীজি (ﷺ) কোথায় নির্জনে ইবাদত করতেন?
উঃ হেরা গুহায়।
৬. নবীজির স্ত্রী কে ছিলেন?
উঃ খাদিজা (রা.)।
৭. খাদিজা (রা.) নবীজিকে কী দিয়েছিলেন?
উঃ সাহস ও সান্ত্বনা।
৮. ওয়ারাকাহ ইবন নাওফাল কী বলেছিলেন?
উঃ এটি আল্লাহর পাঠানো ফেরেশতার আগমন।
৯. প্রথম ওহীর মূল শিক্ষা কী?
উঃ জ্ঞান অর্জন ও আল্লাহর নামে পড়া।
১০. এই গল্প থেকে কী শিখি?
উঃ সত্যবাদীতা, জ্ঞান ও আল্লাহর ওপর ভরসার গুরুত্ব।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url