সাহসী রাখাল ও তিন বন্ধুর গল্প
সাহসী রাখাল ও তিন জন ছেলের গল্প
বাংলার সবুজ-শ্যামল গ্রামগুলোতে আজও এমন অনেক গল্প লুকিয়ে আছে, যেখানে সাহস, বন্ধুত্ব এবং মানবতার অপূর্ব দৃষ্টান্ত দেখা যায়। এই গল্পটিও তেমনই এক গ্রামের। গ্রামের এক প্রান্তে বাস করত রাখাল নামে এক দরিদ্র কিন্তু সৎ ও পরিশ্রমী ছেলে। প্রতিদিনের মতো সে তার ভেড়াগুলো নিয়ে মাঠে চরাতে যেত। অন্যদিকে কাসেম, মালেক ও কাদের নামে তিন বন্ধু আনন্দে ঘুরতে বেরিয়েছিল। তারা জানত না, সেদিনের সেই সাধারণ ভ্রমণ তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে।
তিনজন বন্ধু প্রচণ্ড রোদে পিপাসায় কাতর হয়ে তারা একটি পুরোনো বটগাছের কাছে বিশ্রাম নিতে যায়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একের পর এক তিন বন্ধুই কুয়ার গভীরে পড়ে যায়। চারদিকে সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। তখন তাদের অসহায় চিৎকার ভেসে আসে দূরে ভেড়া চরাতে থাকা রাখালের কানে। এরপর কী ঘটেছিল? কীভাবে এক গরিব রাখাল নিজের সাহস, বুদ্ধি ও মানবতার পরিচয় দিয়ে তিন বন্ধুর জীবন বাঁচিয়েছিল? সেই রোমাঞ্চকর ও শিক্ষণীয় ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই গল্পে।
রাখাল ও তিনজন বন্ধুর গল্প
গ্রামের এক প্রান্তে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে থাকত রাখাল এবং তার সাথে থাকত তার বাবা মা। তাদের পরিবার ছিল খুবই গরিব। তার বাবা ছিলেন দিনমজুর, আর মা বাড়ির কাজকর্ম করতেন। তাদের পরিবারে সব সময় অভাব অনটন লেগেই থাকত।
সংসারে অভাব থাকলেও রাখালের মন ছিল অনেক বড়। সে ছিল পরিশ্রমী, সাহসী এবং দয়ালু একজন ছেলে। সে প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে সে তার কয়েকটি ভেড়া নিয়ে মাঠে চরাতে যেত।
রাখালের গ্রামের পাশে ছিল একটি বিশাল সবুজ মাঠ। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পুরোনো বটগাছ। সেই গাছের কাছেই ছিল একটি গভীর কুয়া। কুয়াটি অনেক পুরোনো হওয়ায় গ্রামের লোকেরা সেখানে খুব একটা যেত না। কুয়াতে খুব অল্প পরিমাণে পানি ছিল। কুয়ার চারপাশে কোনো মজবুত ঘেরাও ছিল না, তাই সবাইকে সাবধানে চলাফেরা করতে হতো।
একদিন ভোরে রাখাল তার ভেড়াগুলো নিয়ে মাঠে গেল। আকাশ ছিল পরিষ্কার, মৃদু বাতাস বইছিল, আর চারদিকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ভেড়াগুলো মাঠের নরম ঘাস খেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রাখাল একটি গাছের ছায়ায় বসে বাঁশি বাজাতে লাগল।
সেই দিনই পাশের গ্রামের তিন বন্ধু: কাসেম, মালেক ও কাদের ঘুরতে বের হলো। তারা তিনজনই খুব ভালো বন্ধু ছিল। কাসেম ছিল বুদ্ধিমান, মালেক ছিল চঞ্চল আর কাদের ছিল সবচেয়ে মোটা ও খেতে খুব ভালোবাসত।
সকালে তারা সিদ্ধান্ত নিল মাঠের দিকে ঘুরতে যাবে।
কাসেম বলল,
— চলো বন্ধু, আজ গ্রামের বাইরে একটু ঘুরে আসি।
মালেক বলল,
— হ্যাঁ, অনেক দিন কোথাও যাওয়া হয় না।
কাদের হাসতে হাসতে বলল,
— চল, তবে সঙ্গে কিছু খাবারও নিয়ে যাই।
কাসেম বলল, মনে রেখো আমরা কিন্তু দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরে আসবো। এখন সবাই খাবার, পানি, ও বিশ্রাম এর জন্য সকল জিনিস পত্র নিয়ে নাও।
তিন বন্ধু প্রয়োজনীয় সকল জিনিস নিয়ে মাঠের দিকে রওনা দিল। তারা গল্প করতে করতে হাঁটছিল। কখনো পাখি দেখছিল, কখনো ফুল দেখছিল, আবার কখনো মজা করছিল।
দুপুরের দিকে সূর্যের তাপ বেড়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে তাদের প্রচণ্ড পিপাসা পেল। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিল মাঠের কোনায় থাকা বটগাছের নিচে সবাই বিশ্রাম নেবে এবং সেখানে দুপুরে খাবার খাবে।
মালেক বলল,
— আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। এখানে বসে যায়, পরে এই বিশাল মাঠ পেরিয়ে জঙ্গল থেকে ঘুরে আসা যাবে।
তিন জন বন্ধু বটগাছের পাশে বসে দুপুর খাবার খেল এবং কিছুক্ষণ আরাম করল।
তারপর কাদের চারদিকে তাকিয়ে বলল; দেখো, সামনে একটা পুরোনো কুয়ো এটা এখনো কি ব্যবহার করে?
কাদের বলল, জানি না। চলো একবার দেখা যাক কত বড় কুয়ো এবং এখনো পানি আছে কিনা।
তিন বন্ধু দ্রুত কুয়ার দিকে এগিয়ে গেল।
কুয়ার কাছে পৌঁছে তারা দেখল, সত্যিই সেখানে পানি আছে। কিন্তু কুয়াতে খুব কম পরিমাণ পানি ছিল।
কাসেম সাবধানে দাঁড়িয়ে বলল; পানি মনে হচ্ছে কোমোর পর্যন্ত হবে। সবাই সাবধানে থেকো। পড়ে গেলে হাত পায়ে ব্যাথা হতে পারে।
কিন্তু কাদের ছিল একটু অস্থির স্বভাবের। সে তাড়াতাড়ি পানি দেখার জন্য কুয়ার কিনারায় গিয়ে ঝুঁকল।
হঠাৎ তার পা পিছলে গেল। আআআআ...! চিৎকার করে কাদের সোজা কুয়ার ভেতরে পড়ে গেল। ঝপাং! পানির শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
কাসেম ও মালেক ভয় পেয়ে গেল। মালেক চিৎকার করে বলল; কাদের! কাদের! তুমি ঠিক আছো?
কুয়ার ভেতর থেকে কাদেরের কণ্ঠ শোনা গেল,
— আমাকে বাঁচাও! আমাকে এখান থেকে তোলো!
কাসেম দ্রুত চারদিকে তাকিয়ে একটি পুরোনো দড়ি দেখতে পেল।
সে বলল,
— মালেক, তাড়াতাড়ি! এই দড়ি দিয়ে কাদেরকে তুলতে হবে।
দুজন মিলে দড়ির এক মাথা কুয়ার ভেতরে ফেলল।
কাদের দড়ি ধরার চেষ্টা করতে লাগল।
মালেক বলল,
— শক্ত করে ধরো!
কাদের দড়ি ধরতেই কাসেম ও মালেক টান দিতে শুরু করল।
কিন্তু কাদের ছিল অনেক ভারী।
তারা প্রাণপণ চেষ্টা করলেও তাকে উপরে তুলতে পারছিল না।
হঠাৎ দড়ি টানতে গিয়ে মালেকের পা পিছলে গেল।
— বাঁচাও!
সে সোজা কুয়ার ভেতরে পড়ে গেল।
এবার কুয়ার ভেতরে দুইজন।
মালেক ও কাদের দুজনই সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে লাগল।
কাসেম আরো বেশি ভয় পেয়ে গেল। সে একা দাঁড়িয়ে কী করবে বুঝতে পারছিল না।
কাসেম বলল,
— তোমরা ভয় পেয়ো না, আমি তোমাদের তুলছি।
সে আরও শক্ত করে দড়ি ধরল এবং টানার চেষ্টা করল। কিন্তু কাসেম এর পক্ষে একা দুইজনকে তোলা অসম্ভব ছিল।
হঠাৎ সে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল।
— ওহ না!
ধপাস!
কাসেমও কুয়ার ভেতরে পড়ে গেল।
এখন তিন বন্ধুই কুয়ার মধ্যে আটকা।
তারা সবাই মিলে চিৎকার করতে লাগল,
— বাঁচাও! বাঁচাও!
— কেউ আছেন?
— আমাদের বাঁচান!
— বাঁচাও!
কুয়ার চারপাশে তখন কেউ ছিল না।
তারা আরও জোরে চিৎকার করতে লাগল।
অন্যদিকে রাখাল তখন মাঠের অন্য পাশে ভেড়া চরাচ্ছিল।
হঠাৎ সে দূর থেকে অস্পষ্টভাবে কারও চিৎকার শুনতে পেল।
সে কান পেতে শুনল।
আবার শোনা গেল, বাঁচাও! বাঁচাও!
রাখাল উঠে দাঁড়াল।
সে ভাবল, “কেউ নিশ্চয়ই বিপদে পড়েছে।”
সে দ্রুত শব্দের দিকে ছুটতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর সে কুয়ার কাছে পৌঁছাল।
কুয়ার ভেতরে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।
তিনটি ছেলে পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে সাহায্যের জন্য হাত নাড়ছে।
রাখাল বলল,
— তোমরা কারা? এখানে কী করছ?
কাসেম বলল,
— ভাই, আগে আমাদের বাঁচাও! পরে সব বলব।
রাখাল বলল,
— ভয় পেয়ো না। আমি চেষ্টা করছি।
সে চারদিকে তাকাল এবং একটি শক্ত বটগাছের লতি জোগাড় করল।
তারপর বটের গাছের সঙ্গে লতিটিকে শক্ত করে বাঁধল এবং লতির আরেক মাথা কুয়ার মধ্যে নামিয়ে দিল।
রাখাল বলল,
— একজন একজন করে উপরে ওঠো।
প্রথমে কাদের উঠতে চেষ্টা করল।
কিন্তু সে ভারী হওয়ায় কষ্ট হচ্ছিল।
রাখাল নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে লতিটি টানতে লাগল।
অনেক কষ্টের পর কাদের উপরে উঠে এল।
মাটিতে উঠেই সে হাঁপাতে লাগল।
তারপর রাখাল আবার দড়ি নামাল।
এবার মালেক উঠল।
মালেকও নিরাপদে উপরে চলে এল।
সবশেষে কাসেম লতি ধরে উপরে উঠল।
তিনজনই কুয়া থেকে বের হয়ে মাটিতে বসে পড়ল।
তারা তখনও ভয়ে কাঁপছিল।
রাখাল বলল, এখন তোমরা নিরাপদ। একটু বিশ্রাম নাও।
কিছুক্ষণ পর তারা স্বাভাবিক হলো।
রাখাল তাদের কাছে কিছু পানি দিল।
তারা পানি পান করল।
এরপর রাখাল জিজ্ঞেস করল,
— এবার বলো, তোমরা কারা? তোমরা এখানে কুয়োতে পড়লে কীভাবে?
কাসেম সকল কে পরিচয় করিয়ে দিল, কাসেম বলল, আমার নাম কাসেম। আমার ডানপাশে যে আছে এর নাম মালেক এবং আমার বামপাশে যে আছে এর নাম কাদের। আমাদের সবার বাড়ি পাশের গ্ৰামে আমরা ঘুরতে এসেছিলাম এবং কুয়োটি দেখার সময় কাদের প্রথমে পড়ে যায় এবং একে একে আমরা তিন জন বন্ধুই কুয়োতে পড়ে যায়।
রাখাল হাসল।
তারপর বলল, আমার ভালো কোন পরিচয় নেই। আমি আমি এই মাঠে রাখালি করি। আমি এই গ্রামের ছেলে। প্রতিদিন এখানে ভেড়া চরাই।
কাসেম বলল,
— ভাই রাখাল, তুমি না থাকলে আজ আমরা বাঁচতাম না।
রাখাল বলল,
— যেকোনো কুয়া বা গভীর জায়গার কাছে খুব সাবধানে যেতে হয়।
কাসেম বলল,
— আজ আমরা বড় শিক্ষা পেলাম।
মালেক বলল,
— আর কখনো এমন অসাবধানতা করব না।
কাদের বলল,
— বিশেষ করে আমি আর কুয়ার কিনারায় গিয়ে ঝুঁকব না।
সবাই হেসে উঠল।
বিকেলের দিকে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ল।
মাঠের উপর সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ল।
তিন বন্ধু এবার বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিল।
কাসেম রাখালের হাত ধরে বলল,
— তুমি আমাদের জীবন বাঁচিয়েছ।
মালেক বলল,
— তোমার এই উপকার আমরা কখনো ভুলব না।
কাদের বলল,
— তুমি সত্যিই একজন সাহসী ছেলে।
রাখাল মুচকি হেসে বলল,
— মানুষের বিপদে সাহায্য করাই সবচেয়ে বড় কাজ।
কাসেম বলল,
— আমরা আবার তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসব।
মালেক বলল,
— তখন আর কুয়ার কাছে যাব না!
কাদের বলল,
— আর গেলে অনেক সাবধানে যাব।
আবার সবাই হেসে উঠল।
তারপর তিন বন্ধু একসঙ্গে বলল,
— ধন্যবাদ, রাখাল!
রাখাল হাত নেড়ে বিদায় জানাল।
তিন বন্ধু নিজেদের গ্রামের পথে হাঁটতে লাগল।
রাখালও তার ভেড়াগুলো নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
সেদিনের ঘটনার পর কাসেম, মালেক ও কাদের সবসময় সাবধানে চলাফেরা করত। আর তারা কখনো ভুলে যায়নি সেই গরিব কিন্তু সাহসী রাখাল ছেলেটির কথা, যে নিজের সাহস, বুদ্ধি ও দয়ার মাধ্যমে তাদের জীবন রক্ষা করেছিল।
রাখাল ও তিনজন বন্ধু গল্পের নীতিশিক্ষা
বিপদের সময় সাহস, বুদ্ধি ও মানবতা মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। আর অসাবধানতা কখনো কখনো বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাই, বিপদজনক জায়গায় পৌঁছার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং কোনো বন্ধু বিপদে পড়লে ছেড়ে যেতে হয় না। বরং, বিপদে পড়া বন্ধু কে সাহায্য করতে হয়।
আরো গল্প পড়ুন,

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url