সুখু আর দুখু গল্প - দুই বোনের দুই রকম চরিত্র
ভালো ও খারাপ চরিত্র নিয়ে সুখু ও দুখু
সুখু আর দুখু বাংলা সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় রূপকথার গল্প। এই গল্পে দুই বোনের ভিন্ন স্বভাব, আচরণ ও জীবনের পরিণতি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সুখু ছিল অলস ও লোভী, আর দুখু ছিল পরিশ্রমী, নম্র ও দয়ালু। তাদের কাজ ও ব্যবহারের ফলাফল থেকেই গল্পের মূল শিক্ষা প্রকাশ পায়। শিশু-কিশোরদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি গল্পটি সততা, পরিশ্রম ও মানবিকতার গুরুত্বও তুলে ধরে।
সুখু আর দুখু একটি জনপ্রিয় রূপকথার গল্প। সুখু আর দুখু গল্পে সততা, পরিশ্রম ও ভালো আচরণের পুরস্কার এবং লোভের পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে।
সুখু আর দুখুর গল্প
দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
এক ছিল তাতি। তাঁর দুই মেয়ে। বড়ো মেয়ের নাম সুখু। আর ছোটো মেয়ের নাম দুখু। বড়ো মেয়ে ঘরের কোনো কাজ করে না। সুখু বসে বসে খায়। দুখু ঘরের সব কাজ করে। সময় পেলে বাবার জন্য সুতা কেটে দেয়।
একদিন দুখু তুলা রোদে দিয়ে উঠানে বসে আছে। এমন সময়ে দমকা বাতাস এসে দুখুর তুলা উড়িয়ে নিয়ে গেল। দুখু মনের দুঃখে কাঁদতে লাগল।
তখন বাতাস বলল, 'দুখু, কেঁদো না। আমার সাথে এসো। তোমাকে তুলা দেবো।’
সুখু আর দুখু
দুখু কাঁদতে কাঁদতে বাতাসের পিছু পিছু গেল।
যেতে যেতে একটা কলাগাছের পাশে লেখা হলো। কলাগাছ বলল, 'দুখু, কোথায় যাচ্ছ? আমাকে অনেক লতাপাতা দিয়ে ধরেছে। এগুলোকে একটু সরিয়ে দিয়ে যাবে?'
কলাগাছের কথা শুনে দুখু থামল। তারপর কলাগাছের গায়ে থাকা লতাপাতা সরিয়ে দিলো।
খানিক দূর যেতেই এক যোড়া দুখুকে ডাকল। বলল, 'দুখু, কোথায় যাচ্ছ? আমাকে কিছু কচি ঘাস দিয়ে যাবে?'
ঘোড়ার কথা শুনে দুখু দাঁড়াল। কচি ঘাস কেটে ষোড়াকে খেতে দিলো। তারপর বাতাসের সাথে চলতে লাগল।
চলতে চলতে দুখু ধবধবে সাদা একটা বাড়িতে গিয়ে হাজির হলো। সেই বাড়ির দাওয়ায় বসে এক বুড়ি চরকা কাটছে। গায়ে সাদা শাড়ি। চুলগুলোও দুধের সতো সাদা।
বাতাস বলল, 'দুখু, তুমি বুড়ির কাছে যাও। তার কাছে তুলা চাও, পাবে।'
দুখু তখন বুড়ির কাছে গেল। নরম গলায় বলল, 'বুড়ি মা, তুমি কেমন আছ?'
বুড়ি তাকিয়ে দেখে, ছোট্ট একটা মেয়ে। কী মিষ্টি তার কথা! বুড়ি বলল, 'ভালো আছি, বাছা। ডাকছ কেন?'
দুখু বলল, 'আমার সব তুলা বাতাস উড়িয়ে তোমার কাছে এনেছে!'
বুড়ি বলল, 'ও ঘরে গামছা আছে, কাপড় আছে। ওগুলো নিয়ে ওই পুকুরে ডুব দিয়ে এসো। তারপর এই ঘরে খাবার আছে, খাও। এরপর তুলা নিয়ো।'
ঘরে গিয়ে দুখু দেখে কত দামি দামি গামছা, কাপড়। কিছু সে লোত করল না। সাধারণ একটা গামছা আর একটা কাপড় নিল। তারপর পুকুরে ডুব দিতে গেল।
কিছু কী অদ্ভুত! একটা ডুব দিতেই দুখুর গা সোনার গয়নায় ভরে গেল।
পুকুর থেকে উঠে খাবার ঘরে গেল দুখু। এত এত মজার খাবার সেখানে! দুখু লোভ করল না। শুধু একটু পান্তা ভাত খেলো। তারপর বুড়ির কাছে এলো।
বুড়ি বলল, 'এখন তুমি ওই ঘরে যাও। যত তুলা লাগে নিয়ে যাও।'
তুলার ঘরে গিয়ে দুখু অবাক হয়ে গেল। কিন্তু সব তুলা সে নিলো না। যতটুকু তুলা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে এসেছিল, ততটুকু তুলা সে প্যাটরায় ভরে নিলো। তারপর সে বুড়ির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলো।
ফেরার পথে ঘোড়ার সাথে দেখা। ঘোড়া বলল, 'দুখু, এসো এসো। তোমাকে আমি আর বন দেবো? এই নাও।' এই বলে সে একটা পঙ্খিরাজ ঘোড়ার বাচ্চা দিলো।
একটু পরে কলাগাছের সাথে দেখা হলো। কলাগাছ বলল, 'দুখু, এসো, এসো। তোমাকে আর নি দেবো? এই নাও।' এই বলে কলাগাছ মস্ত এক ছড়া সোনার কলা দিলো।
দুখু তুলার প্যাটরা, ঘোড়ার বাচ্চা আর কলার ছড়া নিয়ে বাড়ি ফিরল। এত কিছু দেখে সবাই অবাক! তার উপর দুখুর গা ভরতি গয়না।
সব শুনে সুখুর লোভ হলো। পরদিন সে উঠানে বসল চরকা কাটতে। কিন্তু চরকা ঘুরানোর আগেই জোরে বাতাস এলো। সেই বাতাস সুখুর সব তুলা উড়িরে নিয়ে গেল। সুখু বাতাসের পিছন পিছন ছুটল।
পথের পাশের কলাগাছ সুখুকে ডাকল। বলল, 'সুখু, কোথায় যাচ্ছ? একটু শুনে যাও।'
সুখু ফিরেও তাকাল না। বলল, 'আমার সময় নেই। আমি যাচ্ছি বুড়ির কাছে।'
একটু পরে সেই ঘোড়াও সুখুকে ডাকল। সুখু তার দিকেও ফিরে তাকাল না। শুখু কঠিন পলায় বলল, 'আমি যাচ্ছি বুড়ির বাড়ি। তোমার কথা শুনতে আমার বয়েই গেছে!'
বাতাসের সাথে সাথে সুখু গেল বুড়ির বাড়ি। গিয়েই বুড়িকে বলল, 'ও বুড়ি! তুই বসে বসে কী করছিস? আগে আমার জিনিস দে। তারপর সুতা কাটিস।'
সুখুর কথা শুনে বুড়ি মনে কষ্ট পেল। তবু বলল, 'ও ঘরে গামছা আছে, কাপড় আছে। ওগুলো নিয়ে পুকুরে ডুব দিয়ে এসো। তারপর এই ঘরে খাবার আছে, খাও। এরপর দেবো।'
সুখু তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকল। সবচেয়ে দামি গামছা আর দামি কাপড় নিলো। তারপর পুকুরে গেল ডুব দিতে।
সে ভাবল, বেশি বেশি ডুব দিলে বেশি বেশি গয়না পাবে। তাই ইচ্ছামতো ডুর দিতে লাগল। একটু পরে বুঝতে পারল তার সারা শরীর চুলকাচ্ছে। কথা বলতে গিয়ে দেখল এমন শোনাচ্ছে, 'আঁমাঁর সাঁরা শরীর চুলকাঁচ্ছে কেন?
বুড়ির নামে খারাপ কথা বলে সুখু খাওয়ার ঘরে গেল। সেখানে পায়েস, পিঠা আর ভালো ভালো খাবার ছিল। সুখু সেগুলো গপ গপ করে খেতে লাগল। পেট ঢোল করে খেয়ে এলো বুড়ির কাছে। কঠিন পলায় সুখু বলল, 'আর দেরি করতে পাঁরব নাঁ। আঁমাঁর তুলাঁ তাঁড়াঁতাঁড়ি দে।'
বুড়ি বলল, 'ওই ঘরে যাও। তোমার তুলা তুমি নিয়ে যাও।’
সুখু তুলার ঘরে গেল। বিশাল এক প্যাটরা ভরে ইচ্ছামতো তুলা নিলো। তারপর সেটা কাঁধে নিতেই কুঁজো হয়ে গেল। তারপর গা চুলকাতে চুলকাতে বাড়ির পথ ধরল।
খানিক পরে পথে ঘোড়ার সাথে দেখা হলো। সুখুকে দেখে যোড়া দিলো একটা লাথি। লাথি খেয়ে সুখু ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে হাঁটতে লাগল।
এরপর দেখা হলো কলাগাছের সাথে। কলাগাছের একটা বড়ো পাতা ভেঙে পড়ল সুখুর মাথায়। সুখু 'মলীম মলীম' বলে সেখান থেকে পালাল।
বাড়িতে ফিরে সুখু ভারী প্যাটরা নিচে রাখল। তারপর ইচ্ছামতো গা চুলকিয়ে নিলো। এরপর সবাইকে ডেকে বলল, 'আঁমি চলে এসেছি।'
সুখুর অবস্থা দেখে আর কথা শুনে সবাই থ হয়ে গেল।
প্যাটরা খুলে সুখু কোনো তুলাও পেল না।
সুখু আর দুখু গল্পের মূলভাব
“সুখু আর দুখু” গল্পে দেখানো হয়েছে যে ভালো ব্যবহার, পরিশ্রম, নম্রতা ও সততার ফল সবসময় ভালো হয়। দুখু ছিল পরিশ্রমী, ভদ্র ও দয়ালু। সে অন্যের উপকার করত এবং কখনো লোভ করত না। তাই সে পুরস্কার হিসেবে সুখ, সম্পদ ও সম্মান লাভ করে।
অন্যদিকে সুখু ছিল অলস, অহংকারী ও লোভী। সে কাউকে সাহায্য করত না এবং সবকিছু নিজের জন্য চাইত। ফলে সে শাস্তি পায়। গল্পের শিক্ষা: সৎ ও পরিশ্রমী মানুষের শেষ পর্যন্ত জয় হয়, আর লোভ ও অহংকার মানুষের ক্ষতির কারণ হয়।
সুখু আর দুখু গল্পের প্রশ্ন উত্তর
১০টি গুরুত্বপূর্ণ ও উপযোগী প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হল:
১. সুখু ও দুখু কার মেয়ে ছিল?
উত্তর: সুখু ও দুখু একজন তাতির মেয়ে ছিল।
২. দুখু ঘরে কী কাজ করত?
উত্তর: দুখু ঘরের সব কাজ করত এবং বাবার জন্য সুতা কাটত।
৩. দুখুর তুলা কে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল?
উত্তর: বাতাস দুখুর তুলা উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
৪. কলাগাছ দুখুর কাছে কী সাহায্য চেয়েছিল?
উত্তর: কলাগাছ তার গায়ে জড়িয়ে থাকা লতাপাতা সরিয়ে দিতে বলেছিল।
৫. দুখু ঘোড়াকে কী খেতে দিয়েছিল?
উত্তর: দুখু ঘোড়াকে কচি ঘাস খেতে দিয়েছিল।
৬. বুড়ি দুখুকে কী করতে বলেছিল?
উত্তর: বুড়ি দুখুকে পুকুরে ডুব দিতে, খাবার খেতে এবং পরে তুলা নিতে বলেছিল।
৭. দুখু কীভাবে পুরস্কার পেয়েছিল?
উত্তর: তার ভদ্রতা, সততা ও দয়ালু স্বভাবের জন্য সে সোনার গয়না, সোনার কলা ও পঙ্খিরাজ ঘোড়ার বাচ্চা পেয়েছিল।
৮. সুখু কেন শাস্তি পেয়েছিল?
উত্তর: সুখু ছিল লোভী, অলস ও অভদ্র। তাই সে শাস্তি পেয়েছিল।
৯. ঘোড়া সুখুর সঙ্গে কী করেছিল?
উত্তর: ঘোড়া সুখুকে একটি লাথি মেরেছিল।
১০. গল্পটির শিক্ষা কী?
উত্তর: পরিশ্রম, সততা ও ভালো আচরণের ফল ভালো হয়, আর লোভ ও অহংকারের ফল খারাপ হয়।
সুখু আর দুখু রচনা
ভূমিকা
বাংলা লোকসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় রূপকথা হলো “সুখু আর দুখু”। এই গল্পটি লিখেছেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার। গল্পটিতে ভালো ও মন্দ চরিত্রের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষার সুন্দর উপস্থাপন করা হয়েছে।
গল্পের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
এক তাতির দুই মেয়ে ছিল—সুখু ও দুখু। সুখু ছিল অলস ও লোভী। সে কোনো কাজ করত না। অন্যদিকে দুখু ছিল পরিশ্রমী, নম্র ও দয়ালু। একদিন বাতাস দুখুর তুলা উড়িয়ে নিয়ে যায়। তুলা খুঁজতে গিয়ে দুখু পথে কলাগাছ ও ঘোড়ার উপকার করে। পরে সে এক বুড়ির বাড়িতে পৌঁছে। সেখানে তার ভদ্রতা ও সংযমের জন্য সে অনেক পুরস্কার পায়।
এসব দেখে সুখুর লোভ হয়। সেও একই পথে যায়, কিন্তু কাউকে সাহায্য করে না এবং বুড়ির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। তার লোভ ও অহংকারের কারণে সে শাস্তি পায় এবং অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরে আসে।
শিক্ষামূলক দিক
গল্পটি আমাদের শেখায় যে পরিশ্রম, সততা, নম্রতা ও দয়ার মূল্য অনেক। যারা অন্যের উপকার করে এবং লোভ থেকে দূরে থাকে, তারা জীবনে সফল হয়। আর যারা অহংকারী ও লোভী হয়, তারা শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপসংহার
“সুখু আর দুখু” শুধু একটি রূপকথা নয়, এটি একটি শিক্ষামূলক গল্প। গল্পটি শিশুদের নৈতিক শিক্ষা দেয় এবং ভালো মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়। তাই এই গল্পটি বাংলা সাহিত্যের একটি মূল্যবান সম্পদ।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url