চিল ও বিড়াল গল্প হালিমা খাতুন
দুষ্টু বিড়াল এবং বুদ্ধিমান চিলের বাচ্চার গল্প
চিল ও বিড়াল একটি শিক্ষামূলক ও আনন্দদায়ক শিশুতোষ গল্প। গল্পটিতে একটি চিল পরিবারের জীবন, তাদের দুষ্টু বাচ্চাদের আচরণ এবং একটি ধূর্ত বিড়ালের কৌশলের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
বিপদের সময় বুদ্ধিমত্তা, সতর্কতা এবং ঐক্যের গুরুত্ব এই গল্পের মাধ্যমে সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ছোটদের জন্য এটি যেমন বিনোদনের উৎস, তেমনি বড়দের উপদেশ মেনে চলা এবং বিপদে সাহসী হওয়ার মূল্যবান শিক্ষাও এই গল্পটি থেকে পাওয়া যায়।
চিল ও বিড়াল মূল গল্প
হালিমা খাতুন
এক গাছে ছিল এক চিলের বাসা। খড়কুটো দিয়ে তৈরি বেশ বড়ো একটা বাসা। বাসায় থাকত বাবা-চিল, মা-চিল আর তিনটি বাচ্চা। মা-বাবা সবসময় বাসায় থাকত না। মাঝে মাঝে তারা খাবার আনতে বের হয়ে যেত।
চিলের বাচ্চাগুলো ছিল খুব দুষ্ট। তারা সবসময় মারামারি আর চেঁচামেচি করত। পেটুকও ছিল ওরা খুব। খাওয়ার জন্যও ওরা রাতদিন চি চি করত। বাবা-মা ওদের থামাতে না পেরে কেবল খাবার এনে ওদের খাওয়াত। খাবার যতক্ষণ ওদের মুখে থাকত, ততক্ষণ ওরা চুপ থাকত। খাবার ফুরিয়ে গেলে মারামারি আর চেঁচামেচি শুরু করত।
পাশের গাছে কোকিলের বাসা। কোকিলের বাচ্চারা মার কাছে গান শিখত। চিলের বাচ্চাদের চেঁচামেচিতে তারা অস্থির হয়ে যেত। তারা ঠিকমতো গান শিখতে পারত না। মাঝে মাঝে এসে কোকিল ভাবত চিলদের পাড়া থেকে সে চলেই যাবে। আবার মাঝে মাঝে এসে কোকিল চিলদের বলত বাচ্চাদের চিৎকার থামাতে। চিল বলত, ওদের নিয়ে আর পারি না। সারাক্ষণ তো খাবার এনে দিচ্ছি, তবুও ওরা থামে না।
একদিন চিলেরা বাসায় নেই। এমন সময় একটা দুষ্ট বিড়াল সেখানে এসে হাজির। বাসার দরজা খোলা দেখে মা-চিল অল্প সময়ের জন্য বাইরে গিয়েছিল। দুষ্ট বিড়ালটা বাসায় ঢুকেই চিলের একটা বাচ্চাকে তাড়া করেছে তাকে খাওয়ার জন্য। বাচ্চাটি পড়ি কি মরি করে চেঁচিয়ে উঠেছে। মা-চিল তখুনি বাসায় এসে ঢুকেছে। বাচ্চাকে চেঁচাতে দেখে মা তাবন বাচ্চা বুঝি খাবার জন্য কাঁদছে। না, ভালো করে তাকিয়ে দেখে কি-একটা বিড়াল বাচ্চাটাকে তাড়া করেছে।
চিল তখন তার বড়ো বড়ো নখ আর ঠোঁট দিয়ে বিড়ালটাকে ধরতে গেল। চিলের সেই চেহারা দেখে বিড়াল ভয়ে দিল এক লাফ। চিলের বাসার নিচে ছিল একটা পুকুর। বিড়াল গিয়ে পড়ল সেই পুকুরের মধ্যে। পুকুরে পড়ে গিয়ে পানি-কাদা খেয়ে বিড়াল ঢোল হরে গেল। ওর গা-টা সব ভিজে চুপসে গেল। ও তখন সত্যি একটা ভিজে বিড়াল হয়ে গেল।
চিলের বাচ্চারা আবার টি টি করতে শুরু করল। চিল তখন আবার খাবার খুঁজতে বের হলো। যাওয়ার সময় ঘরের দরজা ভালো করে আটকে দিয়ে বাচ্চাদের বলল, কাউকে বাসায় আসতে দিবি না। কেউ যদি এসে ডাকে বলবি, মা-বাবা বাসায় নেই। আর খবরদার, দরজা খুলবি না।
বাচ্চারা বলল, আচ্ছা।
চিল বাসার বাইরে বের হয়ে গাছের উঁচু ডালে বসে কিছুক্ষণ চারদিক তাকিয়ে দেখল, তারপর ডানা মেলে উড়ে গেল রূপসা নদীর দিকে।
সেই বিড়ালটা পুকুর থেকে কোনো রকমে উঠে এসে ঘায়ের মধ্যে রোদে বসে গা শুকাল। আর চেটে চেটে হাত-পা পেট-পিঠ সাফ করল। তারপর? তারপর সে চিলের বাসার দিকে রওনা হলো। চিলের বাচ্চার চেহারাটা সে মোটেই ভুলতে পারছিল না। প্রায় তো বাচ্চাটাকে সে ধরেই ফেলেছিল! অস্ত্রের জন্য হাতছাড়া হয়ে গেল। বাচ্চাটাকে খাওয়ার জন্য তার জিভ থেকে প্রায় টপটপ করে ... আচ্ছা থাক সে কথা।
ঘাসের বন থেকে বের হয়ে বিড়াল চিলের বাসার প্রায় কাছাকাছি গিয়ে রাস্তার ধারের এক গর্তের মধ্যে কিছু সময় লুকিয়ে রইল। সেখান থেকে সে দেখতে পেল, চিল দরজা বন্ধ করে গাছের মগডালে কিছু সময় বসে থেকে তারপর উড়ে গেল।
চিল চোখের আড়াল হয়ে গেলে বিড়াল জোরে জোরে হেঁটে চিলের বাসার দিকে গেল। তারপর গাছ বেয়ে উঠে গেল তারপর করে। উঠে গিয়ে চিলের বাসায় কড়া নাড়াতে লাগল।
বাচ্চারা বলল, কে? কে? কে ওখানে?
বিড়াল ভিজে গলায় বলল, আমি তোমাদের খালা গাংচিল। দরজাটা খুলে দে বাছা। অনেক দূর থেকে এসেছি তোদের দেখতে। তোদের মা কেমন রে? তোর বাবা কেমন রে?
তাদের একটু ডেকে দে। কতদিন দেখা হয়নি।
বাচ্চারা বলল, মা-বাবা বাসায় নেই। খালা হও আর যেই হও, দরজা খুলব না।
বিড়াল খুব নম্র করে বলল, মাকে দরকার নেই, তোদের একটু দেখবা। একটু দেখেই আবার চলে যাব। তাদের দেখার জন্য মনটা কেমন করছে।
বাচ্চারা বলল, তা করুক। তোমার মন যেমন ইচ্ছে তেমনি করুক। দরজা আমরা খুলব না। মা মানা করেছে দরজা খুলতে।
বিড়ালের তখন খুব রাগ হয়ে গেছে। সে এক লাখি দিয়ে ওদের বাসার দরজা ভেঙে ফেলে বাসার ভিতরে ঢুকে পড়েছে। চিলের বাচ্চারা তাকে দেখে 'খালা না, বিড়াল!' বলে হাটমাট করে উঠেছে। ওদের চিৎকার শুনে আশপাশের বাসা থেকে পাখি ছুটে এসেছে ওদের বাসায়। বাবা-চিল ও মা-চিলও তখন বাসায় ফিরে এসেছে।
পাখি আর চিলকে দেখে বিড়াল খুব ভয় পেয়ে গেল। সে এদিকে ওদিক পালাবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু চেষ্টা করলেও কী হবে! সব পাখি চারদিক দিয়ে তাকে ঘিরে ফেলল। পাখিরা মিলে দুই বিড়ালকে ঠোকর মারতে গেল। বিড়াল তখন গাছ থেকে তাড়াতাড়ি নেমে চোখ বুজে দৌড় দিল। তারপর একদম উখাও হয়ে গেল কাশবনে।
সেই বিড়াল আর কোনো দিন চিলদের বাসার কাছে যায়নি। চিলের বাচ্চারা এখন আর চিঁ চিঁ করে না। কোকিলের বাচ্চারা এখন মন দিয়ে গান শেখে।
চিল ও বিড়াল গল্পের মূলভাব
চিল ও বিড়াল গল্পের মূলভাব হলো— সতর্কতা, বুদ্ধিমত্তা এবং ঐক্যের মাধ্যমে বিপদ মোকাবিলা করা যায়। চিলের বাচ্চারা মায়ের কথা মেনে দরজা না খুলে বুদ্ধিমানের পরিচয় দেয়। অন্যদিকে, সকল পাখি একসঙ্গে মিলিত হয়ে দুষ্ট বিড়ালকে তাড়িয়ে দেয়। গল্পটি আমাদের শেখায় যে বড়দের উপদেশ মেনে চলা উচিত এবং বিপদের সময় সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করলে শত্রুকে পরাজিত করা সম্ভব।
চিল ও বিড়াল গল্পের প্রশ্ন উত্তর
গল্পটি সম্পর্কে ১৫টি সহজ প্রশ্ন ও উত্তর নিচে তুলে ধরা হয়েছে:
১. চিলের বাসায় কারা থাকত?
উত্তর: চিলের বাসায় বাবা-চিল, মা-চিল এবং তাদের তিনটি বাচ্চা থাকত।
২. চিলের বাচ্চাগুলো কেমন ছিল?
উত্তর: চিলের বাচ্চাগুলো খুব দুষ্ট ও পেটুক ছিল। তারা সবসময় মারামারি ও চেঁচামেচি করত।
৩. পাশের গাছে কার বাসা ছিল?
উত্তর: পাশের গাছে কোকিলের বাসা ছিল।
৪. কোকিলের বাচ্চারা কী শিখত?
উত্তর: কোকিলের বাচ্চারা তাদের মায়ের কাছে গান শিখত।
৫. দুষ্ট বিড়াল কেন চিলের বাসায় এসেছিল?
উত্তর: চিলের বাচ্চাদের ধরে খাওয়ার জন্য দুষ্ট বিড়াল চিলের বাসায় এসেছিল।
৬. মা-চিল বিড়ালকে দেখে কী করেছিল?
উত্তর: মা-চিল তার বড় বড় নখ ও ঠোঁট দিয়ে বিড়ালকে আক্রমণ করতে গিয়েছিল।
৭. বিড়াল কোথায় পড়ে গিয়েছিল?
উত্তর: বিড়ালটি বাসার নিচের পুকুরে পড়ে গিয়েছিল।
৮. বাসা ছাড়ার আগে মা-চিল বাচ্চাদের কী বলেছিল?
উত্তর: মা-চিল বাচ্চাদের কাউকে দরজা না খুলতে এবং বলতে বলেছিল যে মা-বাবা বাসায় নেই।
৯. বিড়াল নিজেকে কার পরিচয় দিয়েছিল?
উত্তর: বিড়াল নিজেকে গাংচিল খালা বলে পরিচয় দিয়েছিল।
১০. চিলের বাচ্চারা দরজা খুলেছিল কি?
উত্তর: না, তারা মায়ের কথা মেনে দরজা খোলেনি।
১১. বিড়াল কীভাবে বাসায় ঢুকেছিল?
উত্তর: বিড়াল জোরে ধাক্কা মেরে বাসার দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকেছিল।
১২. চিলের বাচ্চারা বিড়ালকে দেখে কী বলেছিল?
উত্তর: তারা চিৎকার করে বলেছিল, “খালা না, বিড়াল!”
১৩. চিলের বাচ্চাদের চিৎকার শুনে কারা এসেছিল?
উত্তর: আশপাশের পাখিরা এবং বাবা-চিল ও মা-চিল ছুটে এসেছিল।
১৪. পাখিরা বিড়ালের সঙ্গে কী করেছিল?
উত্তর: পাখিরা মিলে বিড়ালকে ঠোকর মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
১৫. গল্পের শেষে কী ঘটেছিল?
উত্তর: বিড়াল আর কখনো চিলদের বাসার কাছে আসেনি এবং কোকিলের বাচ্চারা শান্তিতে গান শিখতে পেরেছিল।
আরো গল্প পড়ুন,

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url