ঐতিহাসিক আসহাবে কাহাফের গল্প

আসহাবে কাহাফের ঘটনা বাংলা: গুহাবাসীর ঘটনা 

৩০৯ বছর একটানা ঘুম, এটা কি আদোও সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব যদি আল্লাহ তায়ালা চান। কারণ, আল্লাহ তায়ালার কাছে কোন টাইমের সিমাবদ্ধতা নেই। তিনি হলেন অসীম, অনন্ত এবং তিনি হলেন সকল টাইম থেকে মুক্ত একক খোদা। 

আসহাবে কাহাফ (গুহাবাসীর) ঘটনাটি ও ঠিক তেমনি একটি ঘটনা, যেখানে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি সাত জন যুবক ও এক কুকুরের ক্ষেত্রে টাইমের সিমাবদ্ধতা রাখেননি। 

কুরআনের ১৮ নম্বর সূরার মধ্যে আল্লাহ তায়ালা আসহাবে কাহাফের এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন। যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন কীভাবে সাত জন যুবকের ঈমান রক্ষা করেছিলেন এবং এক অত্যাচারী শাসকের অত্যাচার থেকে রক্ষা করে এক গুহায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। 

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আসহাবে কাহাফ (গুহাবাসী) হিসেবে সাত যুবক ও একটি কুকুর কে ডেকেছেন এবং গুহাবাসী যাকে আরবিতে বলা হয়েছে আসহাবে কাহাফ, আল্লাহ তায়ালা তাদের নামেই কুরআনে একটি সূরা নাজিল করেছেন মুহাম্মদ (সা.) এর উপর। 

যখন মুহাম্মদ (সা.) গুহাবাসী রহস্য সম্পর্কে কিছুই জানতেন। 

আসলে, গুহাবাসীর সাথে ঘটা ঘটনাটি ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মদ (সা.) এর আগমনের আগে ঘটেছিল। অর্থাৎ, আসহাবে কাহাফ (গুহাবাসীর) ঘটনাটি কোনো নবীর সময়কার ঘটনা নয় এবং গুহাবাসীররা কোন নবীর উম্মত বা কোন নবীর জামানার মানুষ ও নয়। 
ঐতিহাসিক আসহাবে কাহাফের ঘটনা ও শিক্ষা

যাইহোক, চলুন আমরা মূল গল্পে প্রবেশ করি। গল্পটি কুরআনে বর্ণিত সূরা আসহাবে কাহাফ থেকে নেওয়া হয়েছে এবং ঘটনাটি তাফসিরকারক গণ তাদের তাফসিরে বর্ণনা করেছেন। 

কোরআনে বর্ণিত গুহাবাসীর সাত যুবকের ৩০৯ বছরের ঘুমের রহস্যময় ঘটনা। (গল্প আকারে)

অনেক অনেক দিন আগের কথা। তখন প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের চারিদিকে চলছে রমরমা শাসন। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের সময়কার অত্যাচারী বাদশার নাম ছিল দাকিয়ানোস। 

সে ছিল একজন পৌত্তলিক শাসক বা মূর্তি পূজক। সে সময় সব মানুষ মূর্তি পূজা করত এবং যারা মূর্তি পূজা করত না - তাদের হত্যা করত‌ এবং বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দিত। 

সেই সময় চারিদিকে চলছে জেল, জুলুম, নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড। সে সময় কোনো মানুষ ভালো ছিল। সব মানুষ শান্তি চাই। 

তাঁদের মধ্যে অনেকেই খুঁজে নিল ভিন্ন ধরনের ধর্ম এবং কিছু মানুষ খুঁজে নিল ইসলাম ধর্ম কে। সেই ইসলাম ধর্ম মানে ছিল ঈসায়ী ধর্ম। কারণ রোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগে ঈসা (আঃ) ইসলামের দাওয়াত পালন করে গেছেন। 

‌যাইহোক, নির্যাতন এর মাত্রা বাড়তে থাকলো। 

সে সময় কিছু যুবক একত্ববাদ বা আল্লাহর তায়ালার উপর ঈমান আনায়ন করল এবং তাঁরা আল্লাহ তায়ালার উপর ঈমান রাখতে চাই এবং এই জাহেলী সমাজ থেকে বের হতে চাইলো। 

রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে একজন, দুইজন করে। মোট সাতজন যুবক আল্লাহ তায়ালার উপর ঈমান আনল। 

তাঁরা আল্লাহ তায়ালার উপর ঈমান আনার পর তাদের মধ্যে একটি সমস্যা দেখা দিল। সাতজন যুবকের প্রাচীন রোমান শাসনামলে ঈমান ধরে রাখা খুবই কষ্টকর হয়ে গেল। 

তাঁরা সাতজন যুবক একসাথে হল এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে ঈমান রক্ষার করার জন্য প্রার্থনা করল। 

এরপর, দাকিয়ানোস বিভিন্ন মাধ্যমে বুঝতে পারলেন যে, তাঁর সাম্রাজ্যের মধ্যে এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী মানুষ রয়েছে এবং তাঁরা আল্লাহ তায়ালা কে রব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।‌

দাকিয়ানোস তাদের ধরে কারাগারে পাঠালো এবং বিভিন্ন কৌশলে সাতজন যুবক কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করল। 

রোমান সৈন্য তাঁরা সাতজন যুবক কে খুঁজতে বের হল। পেছনে রোমান সৈন্য ও সামনে ঘোড়া ছুটিয়ে নিরাপদ কোন স্থানের দিকে ছুটছে সাতজন তরুণ। 

তাঁরা পায়ে হেঁটে নিরাপদ স্থান খোঁজার সময় পথি মধ্যে দেখতে পেল একটি কুকুর, তাঁদের দেখে কুকুরটি ঘেও ঘেও করতে লাগলো এবং সাতজন যুবক কুকুরটি কে এড়িয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু, তাঁরা যত হাঁটতে হাঁটতে লাগলো, ততই তাঁদের সাথে কুকুরটি ও চলে আসলো। 

একসময় তাঁরা সিদ্ধান্ত নিল কুকুরটি তাদের সাথেই থাকবে। 

এরপর, সাতজন যুবক জর্ডানের রাজধানী আম্মানের পূর্বে আল-রাজিব বা আবু আলান্ডা নামক এলাকার একটি ছোট গুহায় প্রবেশ করে।

তাফসির ও ঐতিহাসিকিণ বর্ণনা অনুযায়ী আসহাবে কাহাফের (গুহাবাসী) সাত যুবকের নাম হলো: ১. ইয়ামলীখা (Yamlikha), ২. মুকসালমীনা (Muksalmeena), ৩. মাশলীনা (Mashleena), ৪. মারনূশ (Marnush), ৫. দাবারনূশ (Dabarnush), ৬. শাযনূশ (Shaznush), ৭. কাফাশত্বীতূশ (Kafashtitoosh) এবং কুকুরটির নাম হল: কিতমির। 

গুহাতে প্রবেশ করার কিছুক্ষণ পর তাঁদের সবার ঘুম পেল। সাতজন যুবক সহ কুকুরটি সেই গুহায় এক আশ্চর্য ও রহস্যময় ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। 

কুরআনে বর্ণিত রয়েছে যে, তাঁরা যখন ঘুমাতো তখন সূর্য সাতজন যুবক ও কুকুরটির পাশ দিয়ে চলে যেত। যেনো তাঁদের ঘুমে কোন ব্যাঘাত না ঘটে। 

আরো বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী শরীর এপাশ ওপাশ করিয়ে দিতেন। 

এভাবে কেটে গেল বহু বছর। 

এক বছর, দুই বছর, তিন বছর, চার বছর, পাঁচ বছর, ছয় বছর, সাত বছর, আট বছর, নয় বছর ও নয়। আল্লাহ তাআলা আসহাবে কাহাফ (গুহাবাসীদের) ঘুম পাড়িয়ে রাখেন মোট ৩০৯ বছর, যা একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার। 

এরপর, গুহাবাসীদের ঘুম ভাঙে। ঘুম ভাঙার পর সাতজন যুবক একে অপরকে বলা বলি শুরু করল। আমরা মোট কতটা সময় ঘুমিয়েছি। 

তাঁদের মধ্যে কেউ বলল, “এক বেলা”, কেউ বলল, “একদিন” আবার কেউ বলল,"একদিন বা দিনের কিছু অংশ”। তাঁরা জানতো না তাঁরা এক ঘুমে কাটিয়ে ফেলেছে পুরো ৩০৯টি বছর। একদিন বা দিনের কিছু সময় তাঁরা ঘুমাই নি। 

এরপর, তাদের মধ্যে সবার ক্ষুধা লাগল। তাই, তাদের মধ্য থেকে একজন পকেট থেকে কিছু মুদ্রা দিয়ে একজন কে বাজারে পাঠালো রুটি কিনতে। 

সেই যুবক কাহাফ থেকে বের হয়ে বাজারের পথে ধরল। যুবকটি দেখলো সব কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগের মত কোন মূর্তি পূজা নেই, ঘর গুলো নতুন হয়ে গেছে, কাউকে কেউ অত্যাচার করছে না, সব যেনো একদিনে ভালো হয়ে গেছে। 

যুবক শহরের মধ্যে এসে একটি রুটির দোকান খুঁজে বের করল। 

গুহাবাসী যুবক এক রুটি বিক্রেতা কে কিছু মুদ্রা দিল এবং বলল আমাকে সাতটি রুটি দিন। রুটি বিক্রেতা দিরহাম দেখে সন্দেহ হল এবং বলল এগুলো তো খুবই পুরোনো মুদ্রা এই ছেলে তুমি এগুলো কোথায় পেলে? তুমি কি গুপ্তধন পেয়েছো? 

যুবক অবাক হল এবং বলল এগুলো পুরোনো মুদ্রা নয় এবং আমি কোনো গুপ্তধন পাইনি। মুদ্রাটি তো কালকেই নতুন ছিল। আজ তাহলে পুরোনো হল কীভাবে? আমাকে দ্রুত রুটি দিন।

যুবকের প্রতি রুটি বিক্রেতার সন্দেহ হল এবং বলল তুমি নিশ্চয় গুপ্তধন পেয়েছো এবং রুটি বিক্রেতা যুবক কে ধরে ফেলল এবং রাজার নিকট নিয়ে যাওয়া হল। 

রাজার নিকট আসহাবে কাহাফের যুবকটি বলল আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমাকে ছেঁড়ে দিন। আমি শুধু রুটি কিনতে এসেছিলাম। 

রাজা বলল শান্ত হও যুবক। তুমি বল তুমি এই মুদ্রা কোথায় পেলে। 

যুবক বলল রাজা মশাই আপনি রোমান সাম্রাজ্যের রাজা নন। আপনি কে? দাকিয়ানোস কোথায়, তিনি তো একজন পৌত্তলিক রাজা ছিলেন। 

রাজা বলল আমি এই সাম্রাজ্যের নতুন রাজা। আমি বর্তমান বাদশাহ বাইদ্রুস (বা তায়দুস)। আমি একজন ন্যায়পরায়ণ ও একত্ববাদী শাসক। এখানে মুর্তি পূজা নিষিদ্ধ। আমরা এক আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করি। 

এরপর, যুবকটি নানান ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করল। সে বলতে লাগল আমি কোন অপরাধ করিনি। আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি কোনো অপরাধ করিনি। 

এরপর, রাজা যুবকের কাছ থেকে মুদ্রাটি নিল এবং একজন মুদ্রা বিশেষজ্ঞের নিকট মুদ্রাটি দিল। 

রাজা মুদ্রা বিশেষজ্ঞ কে জিজ্ঞেস করল। এটি কোন সময়ের মুদ্রা। মুদ্রা বিশেষজ্ঞ বলল কারাগারে পাঠানো যুবক ঠিক কথাই বলছে আমি মুদ্রাটি বিশ্লেষণ করে দেখেছি। মুদ্রাটি আজ থেকে ৩০৯ বছর আগের একটি মুদ্রা। সেই সময় রোমান সাম্রাজ্যের রাজা ছিল দাকিয়ানোস। যুবকের কাছে পাওয়া এই মুদ্রাটি রাজা দাকিয়ানোসের সময়কার মুদ্রা। 

রাজা অবাক হল এবং বলল এটা কীভাবে সম্ভব। ৩০০ বছরের পুরোনো মুদ্রা নিয়ে একজন যুবক রুটি কিনতে আসলো। রাজা অবাক হল।

যুবক কে আবার ডেকে আনা হল এবং বলা হল তুমি কি এখানে একাই আছো? নাকি আরো তোমার চেনাজানা কেউ আছে। 

যুবকটি বলল আমি একা নই। আমার সাথে আছে আরো ছয় জন এবং একটি কুকুর ও আছে। 

রাজা বলল, তোমরা কোথায় ছিলে এতোদিন। 

যুবক বলল আমরা একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। গুহাটি জর্ডানের রাজধানী আম্মানের পূর্বে আল-রাজিব বা আবু আলান্ডা নামক এলাকার একটি ছোট গুহা। 

এরপর, রাজা বুঝতে পারলেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন সবই আল্লাহ তায়ালার অসীম ক্ষমতা। 

যখন আসহাবে কাহাফ এর একজন সদস্যের উপর যখন এমন ঘটনা ঘটছে। তখন, গুহার মধ্যে বাকি ছয়জন যুবক একে অপরকে বলাবলি করতে লাগল। অনেকক্ষণ তো হল তাঁকে কি রোমান সৈন্যরা ধরে ফেলেছে। 

এরপর, রাজা যুবকটি কে বলল তুমি কি আমাদের সে আসহাব কাহাফ এর বাকি ছয়জন সদস্য কে দেখাবে। 

জি অবস্যই আমি তাদের দেখাবো। 

রাজার অনেক জ্ঞানী গুণী লোক ও যুবক সহ সবাই সেই গুহা দেখতে হাজির হল। 

গুহার নিকট অনেক সৈন্য দেখে গুহাবাসী সকলেই বলতে লাগলো মনে হয় আমরা রোমান সৈন্যদের কাছে আজ ধরা পড়ে যাবো। 

এরপর, রাজার সাথে গুহাবাসীর দেখা হল এবং শেষে আসহাবে কাহাফ এর সদস্যরা বলল আপনাররা চলে যান। আমরা এখানেই থাকতে চাই। 

রাজার সবাই চলে গেল এবং এরপর তাঁরা সেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

আসহাবে কাহাফ এর গল্প থেকে প্রশ্ন ও উত্তর 

১০টি ছোট প্রশ্ন ও উত্তর

১. প্রশ্ন: আসহাবে কাহাফ কারা ছিলেন?

উত্তর: তাঁরা ছিলেন একদল ঈমানদার যুবক, যারা আল্লাহর ওপর বিশ্বাসের কারণে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।

২. প্রশ্ন: আসহাবে কাহাফের ঘটনা কোন সূরায় আছে?

উত্তর: কুরআনের সূরা আল-কাহফে (১৮ নম্বর সূরা)।

৩. প্রশ্ন: তাঁরা কত বছর গুহায় অবস্থান করেছিলেন?

উত্তর: ৩০৯ বছর।

৪. প্রশ্ন: কেন তাঁরা গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন?

উত্তর: ঈমান রক্ষা এবং অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য।

৫. প্রশ্ন: আল্লাহ তাঁদের কীভাবে রক্ষা করেছিলেন?

উত্তর: অলৌকিকভাবে দীর্ঘ সময় ঘুমে রেখে নিরাপদে রক্ষা করেছিলেন।

৬. প্রশ্ন: তাঁদের সঙ্গে আর কী ছিল?

উত্তর: একটি কুকুর ছিল।

৭. প্রশ্ন: ঘুম ভাঙার পর তাঁরা কী ভাবলেন?

উত্তর: তাঁরা মনে করেছিলেন, মাত্র একদিন বা দিনের কিছু অংশ ঘুমিয়েছেন।

৮. প্রশ্ন: এই ঘটনা কী প্রমাণ করে?

উত্তর: আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং পুনরুত্থান সম্ভব।

৯. প্রশ্ন: আসহাবে কাহাফের প্রধান শিক্ষা কী?

উত্তর: ঈমানের জন্য ত্যাগ ও আল্লাহর ওপর ভরসা।

১০. প্রশ্ন: কুরআনে এই ঘটনা কেন বর্ণিত হয়েছে?

উত্তর: মুমিনদের শিক্ষা, ঈমান দৃঢ় করা এবং আল্লাহর নিদর্শন প্রকাশের জন্য।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url