লোভী দুই মালীর গল্প

লোভী দুই মালীর গল্প: রেজাউল ও বাসেত দুই মালির পরিণতি 

আপনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষটি যদি একদিন আপনার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটিই চুরি করে, তাহলে আপনি কী করবেন? শাস্তি দেবেন, নাকি তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দেবেন?

লোভী দুই মালী

আজকের গল্পটি দুই মালির, যারা অভাবের তাড়নায় ভুল পথে পা বাড়িয়েছিল। কিন্তু একজন বিচক্ষণ মালিক তাদের এমন শিক্ষা দিয়েছিলেন, যা শুধু তাদের জীবনই বদলে দেয়নি। বরং আমাদের জন্যও রেখে গেছে সততা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। চলুন গল্লটি পড়ি। 

দুই লোভী মালির শেষ পরিণতি 

নাসের চৌধুরী বারান্দায় বসে ভাবছেন। তার সখের ফুলের বাগানের কথা ভাবছিলেন । কি করা যায় এই ফুল বাগানের? বাগানে তো ফুলে ভর্তি। আমি তো একা মানুষ এতো ফুলের গাছের খেয়াল রাখবো কীভাবে? 

স্যার আপনার চা। 

দাও আমাকে চা টা দাও। ঠান্ডা হয়ে গেলে খাওয়া যাবে না। তাড়াতাড়ি পান করে নেই।‌

আপনি মনে হয় কিছু ভাবছেন চৌধুরী মশাই? 

হ্যাঁ, আমি ভাবছি আমার ফুলের গাছের বাগান নিয়ে। 

আচ্ছা বলো তো মালেক আমার ফুলের বাগানের দেখাশোনা করার জন্য কি করা যায়? 

চৌধুরী মশাই আপনি একজন মালি কে রেখে দিন। সে প্রতিদিন আপনার ফুলের বাগানের দেখাশোনা করবে এবং মাস শেষে কিছু টাকা পারিশ্রমিক দিয়ে দিবেন। 

আমি ভাবছি যে, একজন নয়। বরং, এতো গুলো ফুলের গাছ দেখাশোনা, পানি দেওয়া, যত্ম নেওয়া ইত্যাদি করার জন্য দুইজন বিশ্বস্ত মালি লাগবে। 

চৌধুরী মশাই আমার গ্ৰামের বাড়িতে দুইজন লোক পাওয়া যাবে, যাঁদের কাজের দরকার। তাঁরা সব কাজই পারে। আমার মনে হয় তাঁরা ফুলের গাছ ও দেখাশোনা করতে পারবে। আমি কি তাদের ডাকব চৌধুরী মশাই?

হ্যাঁ, ডাকো তাদেরকে আমার কাছে নিয়ে আসো।

কয়েকদিন পর…..

চৌধুরী মশাই ও চৌধুরী মশাই আমার গ্ৰাম থেকে আমার দুইজন লোক চলে এসেছে। আপনি তাদের দেখে যান। 

মালেক তুমি তাদের বারান্দায় বসতে দাও, আমি ফুলে পানি দেওয়া শেষ হলেই তাদের সাথে কথা বলব। তাদের চা-নাস্তা দাও। 

আচ্ছা চৌধুরী মশাই আমি তাদের বসতে বলছি। আপনি তাড়াতাড়ি আসুন। 

কিছুক্ষণ পর……

কি খবর মালেক তাঁরা কোথায়? 

চৌধুরী মশাই, তাঁরা আপনার জন্য বারান্দায় অপেক্ষা করছে। তাঁরা দুইজন এসেছে এবং তাঁরা বাগানের কাজ করতে দক্ষ।

ঠিক আছে, খুবই ভালো খবর। 

আচ্ছা, তোমাদের নাম কি? 

আমার নাম রেজাউল এবং আপনার পাশে যিনি বসে আছেন তার নাম হল বাসেত। আমরা দুইজন আপনার ফুলের বাগানে কাজ করার জন্য এসেছি।‌

তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে তোমরা আমার ফুলের বাগানের যত্ম নিতে পারবে। তোমরা প্রতি মাসে কত টাকা বেতন চাও। 

রেজাউল বলল, “চৌধুরী মশাই, আপনি যা দেবেন, তাতেই আমরা খুশি।" 

আচ্ছা, তাহলে আজকে বিশ্রাম করো। কাল থেকে কাজ শুরু করবে। মালেক, দুইজন কে তাদের শোয়ার ঘর দেখিয়ে দাও। 

আচ্ছা, চৌধুরী মশাই। 

সকালে তাঁরা কাজ শুরু করল। 

দুইজন মালির কাজ পরিদর্শন করে চৌধুরী মশাই এর খুব ভালো লাগল এবং তাদের কাজের প্রশংসা করলো।

এভাবে কেটে গেল কয়েক মাস। 

একদিন দুইজন মালি একে অপরকে বলল, "আমাদের বেতন কম দেয়, এভাবে তো আমাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। কি করা যায়।”

রেজাউল বলল, “বাসেত আমরা ফুল গুলো সংগ্রহ করার পর স্থানীয় বাজারে বিক্রি করলে কেমন হয়?" 

বাসেত বলল, “খুব ভালো হয়। তবে, আমরা যদি ধরা পড়ে যায়। তখন আমাদের কি হবে? 

রেজাউল বলল, "ধরা পড়বো কেন? আমরা প্রতিদিন রাতে প্রতিটি গাছ থেকে কিছু ফুল সংগ্রহ করব। যেনো চৌধুরী মশাই বুঝতে না পারে।”

বাসেত রেজাউল এর কথায় রাজি হল এবং পরের দিন থেকে তাঁরা ফুল চুরি করা শুরু করল। 

এভাবে বেশ কিছুদিন তাঁরা ফুল গুলো চুরি করলো এবং স্থানীয় বাজারে ফুল বিক্রি করে অনেক টাকা উপার্জন করল। 

একদিন চৌধুরী সাহেবের রাতে ঘুম এলো এবং তিনি সখের ফুলের বাগান ভ্রমণ করার জন্য বের হলো এবং ফুলের বাগানে প্রবেশ করতেই মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পেলো। 

চৌধুরী মশাই একটু নিচু হয়ে বসে পড়লেন এবং দেখার চেষ্টা করলেন। 

চৌধুরী মশাই দেখলো টর্চ লাইট নিয়ে তার দুই মালি গোলাপ, গাঁদা, ও অন্যান্য ফুলের গাছ থেকে ফুল সংগ্রহ করছে। 

কিছুক্ষণ পর…

চৌধুরী মশাই দেখলো তাঁরা তাঁদের শোয়ার ঘরের সামনে ফুল রাখলো। 

চৌধুরী মশাই তার ঘরে চলে গেলেন। 

সকালে দুইজন মালি কে ডেকে পাঠানো হল। 

দুইজন মালি চৌধুরী মশাই এর সামনে এসে দাঁড়ালো এবং তাঁরা জিজ্ঞেস করল চৌধুরী মশাই কিছু বলবেন? 

চৌধুরী মশাই বলল, “তোমাদের আমি বিশ্বাস করে আমার সখের ফুলের বাগানের দেখাশোনা করার জন্য রেখেছিলাম এবং তোমরা এই ফুলের গাছ থেকে ফুল চুরি করে বিক্রি করছো।”

তোমাদের তো লজ্জা হওয়া উচিত।

রেজাউল বলল, “আসলে চৌধুরী মশাই আমরা ফুল চুরি করেছি। আমাদের সংসার সঠিকভাবে চালানোর জন্য। আপনি যদি আমাদের ৫০০০ টাকা বেতন দেন তা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে এই কাজ করে ফেলেছি। আপনি আমাদের দুইজনকে ক্ষমা করুন।” 

চৌধুরী মশাই ছিলেন একজন বুদ্ধিমান মানুষ। তাই, তাঁদের শাস্তি না দিয়ে ফুল বিক্রি করার কাজে লাগিয়ে দিলেন। 

চৌধুরী মশাই বলল, "আমি বুঝতে পেরেছি। তোমাদের অতিরিক্ত টাকা দরকার, যেনো তোমরা তোমাদের সংসার সঠিকভাবে ভাবে চালাতে পারো। আজ থেকে তোমাদের দুইজনের কাজ বেড়ে গেল এবং এটাই হল চুরির সাজা।”

রেজাউল বলল, "চৌধুরী মশাই, আমাদের কোনো শাস্তি দেবেন না। আমাদের সংসারে অন্য কেউ নেই যে, আমাদের সংসার চালাবে। যদি আমাদের শাস্তি দেন, তাহলে আমাদের বউ বাচ্চা না খেতে পেয়ে মরে যাবে। আমাদের প্রতি দয়া করুন।”

চৌধুরী মশাই বলল, “থাক যথেষ্ট হয়েছে। আমি তোমাদের কোন শাস্তি দেয় নি। কারণ, তোমরা কোন অপরাধ করোনি। বরং, তোমাদের সংসার সুখের করার জন্য ফুল চুরি করেছো।" 

চৌধুরী মশাই আরো বলল, “তোমরা বাগানের বিভিন্ন ধরনের ফুল গুলো সংগ্রহ করবে এবং প্রতিদিন ফুল গুলো বাজারে বিক্রি করবে। ফুল বিক্রি থেকে যা লাভ হবে ৩০% তোমাদের দুইজনের এবং বাকি ৭০% আমার।" 

দুইজন মালি চৌধুরী মশাই এর কথা শুনে খুশি হল এবং পুনরায় তাঁরা দুজনই ফুলের বাগানের দেখাশোনা সহ ফুল বিক্রির কাজে নিয়োজিত হল। 

গল্পের শিক্ষা (Moral of the story) 

অভাবেই স্বভাব নষ্ট। মানুষ যখন অভাবে থাকে, তখন তার স্বভাব পরিবর্তন হয়ে যায়। যে ব্যক্তি কোন দিন চুরি করেনি, সে ব্যক্তি ও চুরি করে ফেলে। 

তাই, মালিক পক্ষ কে সব সময় সঠিক পরিমাণ বেতন প্রতি মাসে দিতে হবে, যেনো কর্মচারীরা চুরি করতে না পারে। 

লোভী দুই মালীর গল্প থেকে প্রশ্ন ও উত্তর 

১০টি ছোট প্রশ্ন ও উত্তর

১. গল্পের প্রধান চরিত্র কে?

উত্তর: নাসের চৌধুরী, রেজাউল ও বাসেত।

২. নাসের চৌধুরী কী জন্য মালি নিয়োগ করেছিলেন?

উত্তর: তাঁর ফুলের বাগানের দেখাশোনার জন্য।

৩. দুই মালির নাম কী ছিল?

উত্তর: রেজাউল ও বাসেত।

৪. তারা কেন ফুল চুরি করেছিল?

উত্তর: কম বেতনে সংসার চালাতে কষ্ট হওয়ায়।

৫. তারা চুরি করা ফুল কোথায় বিক্রি করত?

উত্তর: স্থানীয় বাজারে।

৬. চৌধুরী মশাই কীভাবে চুরির ঘটনা জানতে পারেন?

উত্তর: রাতে বাগানে গিয়ে নিজ চোখে দেখেন।

৭. তিনি কি তাদের চাকরি থেকে বের করে দিয়েছিলেন?

উত্তর: না, বরং তাদের ক্ষমা করেছিলেন।

৮. পরে তিনি তাদের কী দায়িত্ব দেন?

উত্তর: নিয়মিত ফুল সংগ্রহ ও বাজারে বিক্রির দায়িত্ব।

৯. ফুল বিক্রির লাভ কীভাবে ভাগ করা হয়?

উত্তর: ৩০% মালিদের এবং ৭০% চৌধুরী মশাইয়ের।

১০. গল্পের মূল শিক্ষা কী?

উত্তর: অভাব মানুষকে ভুল পথে ঠেলে দিতে পারে, তাই ন্যায্য পারিশ্রমিক ও সততা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।

আরো গল্প পড়ুন, 

১. দুই ছেলে দুই ফুল গাছ গল্প 


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url