ঐতিহাসিক হুদায়বিয়া সন্ধি (৬২৮ খ্রিস্টাব্দ)

হুদায়বিয়া সন্ধি: মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে সন্ধি 

হুদায়বিয়া সন্ধি হল মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তিপত্র, যা মক্কার অদূরে হুদায়বিয়া নামক স্থানে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়াই এটি হুদায়বিয়া সন্ধি নামে ইসলামী ইতিহাসে পরিচিতি পায়। 

হুদায়বিয়া সন্ধি কে আরবিতে সুলহ আল-হুদায়বিয়াহ বলা হয়। এটি ছিল একটি শান্তিচুক্তি। সূরা আল-ফাতহ-এর প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এই সন্ধিকে ফাতহুম মুবীন' বা সুস্পষ্ট বিজয় বলে স্বীকৃতি দেন। 

যদিও হুদায়বিয়া সন্ধি কে অনেক সাহাবাগণ ব্যথিত হন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই মনে করতেন এই সন্ধি মুসলমান জন্য নয়। বরং, কুরাইশদের সহায়তা করবে। তবে, আল্লাহর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সকলকে শান্ত ও ধৈর্য ধারণ করার নির্দেশ দেন মহানবী মুহাম্মদ (সা)। 
মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে হুদায়বিয়া সন্ধি হচ্ছে

ছয় বছর পর নিজের জন্মভূমি মক্কার পথে রওনা হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও প্রায় ১,৪০০ সাহাবি। কিন্তু হজ পালনের বদলে তাঁদের সামনে দাঁড়াল যুদ্ধের হুমকি।

এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে একটি আপাতদৃষ্টিতে অসম চুক্তি ইসলামের ইতিহাসে "সুস্পষ্ট বিজয়" হিসেবে স্বীকৃতি পেল? জেনে নিন ঐতিহাসিক হুদায়বিয়া সন্ধির পুরো ঘটনা।

হুদায়বিয়া সন্ধির গল্প 

একদা মুহাম্মদ (সা.) ঘুমিয়ে ছিলেন এবং তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি ও তাঁর সাহাবা সহ মক্কা শরীফ তাওয়াফ করছেন। এমতাবস্থায়, নবীজির (সা.) ঘুম ভেঙ্গে গেল। 

মুহাম্মদ (সা.) নিজের স্বপ্নের কথা সকল সাহাবা কে জানালেন এবং মুহাম্মদ (সা.) সিদ্ধান্ত পবিত্র জিলকদ মাসে হজ পালন করতে নিজ মাতৃভূমি মক্কায় যাবেন। 

মদিনার সকল সাহাবা মক্কায় হজ্জ পালন করার জন্য মহাখুশিতে নিজেদের মধ্যে প্রস্তুতি সারলেন। 

মুহাম্মদ (সা.) সকল সাহাবাগণ কে নির্দেশ দিলেন, তাঁরা যেনো শুধু হজ্জের পোশাক পরিধান করে এবং কুরবানীর পশু সঙ্গে নেয়। নবীজি আরো বললেন আমরা মক্কায় কোনো যুদ্ধের জন্য যাচ্ছি না। সুতরাং, ভারী অস্ত্র নেওয়া থেকে বিরত থাকো এবং শুধু নিজের আত্মরক্ষার জন্য তরবারি নিতে পারো। 

কিছুক্ষণ পর, সকল সাহাবা প্রস্তুত হলেন এবং যাত্রা করার জন্য মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে অনুমতি চাওয়া হল। তখন, মুহাম্মদ (সা.) বললেন তোমরা মোট কত সাহাবা হজ্জ পালনের জন্য যাচ্ছো। আমাকে সঠিক সংখ্যা জানাও। 

দৌড়ে গেলেন একজন সাহাবা এবং কত জন সাহাবা হজ্জ পালনের জন্য যাচ্ছেন তা এক এক করে গুনলেন। 

এরপর, মুহাম্মদ (সা.) কে জানানো হল মোট সাহাবার সংখ্যা প্রায় ১৪০০ জন। ৬২৮ খ্রিস্টাব্দের ৬ই হিজরিতে মুহাম্মদ (সা.) বিসমিল্লাহ বলে যাত্রা শুরু করলেন। 

মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর বিচক্ষণ সাহাবারা এগিয়ে যাচ্ছেন মক্কার দিকে। দুটো চোখে তখন সবার শুধুই স্বপ্ন। ছয় বছর পর মক্কার উদ্যেশ্যে যাত্রা। প্রিয় মাতৃভূমি মক্কা দেখার আগাম অনুভূতি যেনো রোমাঞ্চিত করে তুলছে সকল সাহাবাদের। 

এগিয়ে চলেছে সাহাবারা…..

কিন্তু, মক্কার সন্নিকটে খুজাহ গ্ৰোত্রের সামনে আসতে মুহাম্মদ (সা.) কে সর্তক করলেন একজন লোক। তিনি হলেন সেই গোত্রের বুদাইল বিন ওয়াকার জানালো যে, কুরাইশরা যুদ্ধ করতে মুসলিমদের আক্রমণ করতে আসছে। 

দ্রুত ও বিচক্ষণতার সাথে মুহাম্মদ (সা.) সকল ১৪০০ সাহাবা কে নিয়ে মক্কার নয় মাইল দূরে হুদায়বিয়া নামক স্থানে ঘাঁটি গাড়েন। আসলে, সেই স্থানে একটি কূপ ছিল এবং সেই কূপের নামানুসারে জায়গার নাম হুদায়বিয়া নামকরণ করা হয়। 

এরপর, মুহাম্মদ (সা.) হুদায়বিয়া থেকে হযরত বুদাইল (রা) কে দূত হিসেবে নিয়োগ করেন এবং তাঁকে কুরাইদের নিকট পাঠানো হয়। কুরাইশদের কাছে গিয়ে তিনি বলেন মুহাম্মদ ও তার সঙ্গী সাথীরা নিরস্ত্র, তাঁরা হজ্জ পালনের জন্য এসেছে, তাঁরা যুদ্ধ করতে এখানে আসেনি। 

কুরাইশরা হযরত বুদাইল (রা) এর কথা বিশ্বাস করলেন। 

এরপর, কুরাইশরা ওরওয়া বিন মাসুদ কে সন্ধির জন্য প্রস্তাব নিয়ে পাঠালেন। কিন্তু, তিনি সাহাবাগণ ইচ্ছার প্রতি কটুক্তি করেন এবং সন্ধি না করেই তিনি ফেরত যান। 

এরপর, মুসলিমদের পক্ষ হতে প্রথমে খারাশ বিন উমাইয়া অল খোষাঈকে পাঠানো হয়। কিন্তু, তিনি কোন সুসংবাদ নিয়ে আসতে পারেনি। তিনি হুদায়বিয়া নামক স্থানে ফেলত আসলেন। 

এরপর, মুহাম্মদ (সা.) তাঁর প্রিয় সাহাবী ওসমান (রা.) সন্ধি পত্র নিয়ে পাঠান। তিনি কুরাইশদের নিকট গেলেন এবং তাঁর ফেরত আসতে দেরি হয়ে গেল। সকল সাহাবী ভাবলেন মনে হয় ওসমান (রা) কে কুরাইশরা হত্যার হত্যা করেছে। 

তাই, সকল সাহাবী একটি গাছের নিচে দাঁড়ালেন এবং তাঁরা প্রতিজ্ঞা করলেন, যদি কুরাইশরা ওসমান (রা) কে ফেরত না দেয়। তাহলে, তাঁরা এর প্রতিশোধ গ্ৰহণ করবেন। এই শপথ কে আরবিতে বাইয়াতুল রিদওয়ান” হিসেবে অভিহিত করা হয়, যাকে বাংলায় বলে বৃক্ষের নিচে শপথ গ্রহণ। 

কিছুক্ষণ পর, ওসমান (রা) ফেরত আসেন এবং সঙ্গে নিয়ে আসেন সুহাইল বিন আমর (রা) কে। মূলত তাঁরা ওসমান (রা) এর সঙ্গে সুহাইল বিন আমর (রা) কে পাঠিয়েছেন সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে। 

এরপর, সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে সাহাবা ও কুরাইশদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় এবং শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদ (সা.) কুরাইশদের প্রস্তাব মেনে নেন। 

যে স্থানে এই সন্ধি প্রস্তাব স্বাক্ষরিত হয় তাঁর নামানুসারে এই সন্ধির নাম হয় হুদায়বিয়া সন্ধি। আর এটা ইসলামী ইতিহাসে হুদায়বিয়া সন্ধি নামে পরিচিত।‌

হুদায়বিয়া সন্ধির প্রধান শর্তাবলী গুলোতে মুসলিম ও কুরাইশগণ যা পেয়েছিল।‌

১. এই বছর (৬২৮ খ্রিস্টাব্দে) মুহাম্মদ (সা.) হজ্জ পালনের ব্যাতিত মদিনায় ফেরত যাবেন।

২. মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে আগামী দশবছর কোন যুদ্ধ হবে না।‌ অর্থাৎ, সকল ধরনের যুদ্ধ, বিগ্ৰহ বন্ধ থাকবে। 

৩. মুসলিমগণ আগামী বছর (৬২৮ খ্রিস্টাব্দে) হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসতে পারবে। এই সময় কুরাইশরা মক্কা ছেঁড়ে অন্যত্র চলে যাবে এবং হজ্জ পালনের সময় তাঁরা আসতে পারবে না। 

৪. মুসলিমগণ হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় আসতে চাইলে, শুধু কোষবদ্ধ তরবারি নিয়ে আসতে পারবে। অন্য ভারী অস্ত্র নিয়ে আসতে পারবে না। 

৫. হজ্জ পালনকালে কুরাইশরা মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং কুরাইশরা চাইলে মদিনার পথ ব্যবহার করে মিশ্র, সিরিয়া সহ সকল দেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে। এতে মুসলিমরা কুরাইশদের কোন বাধা প্রদান করবে না। 

৬. আগামী দশ বছর মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তাঁদের উপর কোন প্রকার আক্রমণ করা হবে না। 

৭. পুরো আরবের যে কোন লোক মুহাম্মদ (সা.) বা কুরাইশদের সাথে সন্ধি সূত্রে আবদ্ধ হতে পারবে। 

৮. কোন মক্কাবাসী মদিনায় গিয়ে আশ্রয় গ্ৰহণ করার পর যদি কুরাইশরা চাই, তাহলে তাকে মুসলিমগণ তাকে ফেরত দিবে। আবার মদিনার মুসলিমরা যদি মক্কায় আশ্রয় নেয়, তাহলেও তাকে বাধা প্রদান করতে পারবে না। 

৯. মক্কার প্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী বা পুরুষ যদি মুসলিমদের দলে যোগ দেয়, তাহলে তাঁকে ফেরত দেওয়া হবে না। তবে, মক্কার কোন নাবালক মুসলিমদের দলে যোগ দিলে তাকে ফেরত দেওয়া হবে। 

১০. সন্ধির শর্তাবলী সমূহ মুসলিম ও কুরাইশদের যথাযথ পালন করতে হবে। 

হুদায়বিয়া সন্ধি থেকে ছোট প্রশ্ন ও উত্তর 

১০টি ছোট প্রশ্ন ও উত্তর

১. হুদায়বিয়া সন্ধি কত সালে হয়েছিল?

উত্তর: ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে (৬ হিজরি)।

২. হুদায়বিয়া কোথায় অবস্থিত ছিল?

উত্তর: মক্কার অদূরে হুদায়বিয়া নামক স্থানে।

৩. মুসলমানরা কেন মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন?

উত্তর: উমরাহ (হজ নয়) পালন করার জন্য।

৪. কতজন সাহাবি মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন?

উত্তর: প্রায় ১,৪০০ জন।

৫. হুদায়বিয়া সন্ধিকে আরবিতে কী বলা হয়?

উত্তর: সুলহ আল-হুদায়বিয়াহ।

৬. কোন সাহাবিকে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠানো হয়েছিল?

উত্তর: হযরত উসমান ইবন আফফান (রা.)।

৭. বৃক্ষের নিচে নেওয়া শপথের নাম কী?

উত্তর: বাইআতুর রিদওয়ান।

৮. সন্ধির মেয়াদ কত বছরের ছিল?

উত্তর: ১০ বছর।

৯. কোন সূরায় হুদায়বিয়া সন্ধিকে 'সুস্পষ্ট বিজয়' বলা হয়েছে?

উত্তর: সূরা আল-ফাতহ।

১০. হুদায়বিয়া সন্ধির প্রধান ফলাফল কী ছিল?

উত্তর: আরবে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের দ্রুত প্রসার।





এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url