হুদায়বিয়া সন্ধি থেকে মক্কা বিজয়
মুসলমানদের আরবের মক্কা নগরী বিজয়ের গল্প
আট বছর আগে যে নগরী থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নির্যাতন করে বের করে দিয় ছিল, সেই মক্কায় তিনি ফিরে এলেন ১০,০০০ সাহাবির বিশাল বাহিনী নিয়ে। সবাই ভেবেছিল ভয়াবহ প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
কিন্তু ইতিহাস দেখল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য, মুহাম্মদ (সা)তলোয়ারের পরিবর্তে ক্ষমা, প্রতিশোধের পরিবর্তে দয়া এবং যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
মক্কা বিজয়ের গল্প: হুদায়বিয়া সন্ধি থেকে মক্কা নগরী জয়ের ঘটনা
৬২৮ খ্রি. মুসলমান ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা হুদায়বিয়া সন্ধি নামে পরিচিতি। এই চুক্তির মেয়াদ ছিল দশবছর।
এটা মুহাম্মদ (সা.) এর একটি বড় কৌশল ছিল, যেনো সকল ধরনের যুদ্ধ বিগ্ৰহ বন্ধ রাখা যায়, সঠিকভাবে হজ পালন করা যায়, এবং মক্কা এবং মদীনার মধ্যে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
কিন্তু, কুরাইশরা এই শান্তি কামনা করেনি। তাঁরা ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে হুদায়বিয়া সন্ধি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করল। কারণ গুলোর মধ্যে অন্যতম কারণ ছিলো নবীজির (সা.) এর সঙ্গে মিত্রতাসূত্রে আবদ্ধ বনু খুযায়া গোত্রকে কে বনু বকর গোত্রের দ্বারা আক্রমণ, এবং বনু খুযায়া গোত্রকে আক্রমণ এর জন্য সরাসরি সহায়তা করে হুদায়বিয়া সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী সাফওয়ান, সুহাইল, ও ইকরামা। ফলে হুদায়বিয়া শান্তি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হয়।
বনু খুযায়া গোত্র নবীজির সঙ্গে মিত্রতাসূত্রে আবদ্ধ থাকায় বনু খুযায়া গোত্র কে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন মুহাম্মদ (সা.)।
যদিও যুদ্ধ এড়ানোর জন্য মুহাম্মদ (সা.) কুরাইশদের কাছে একটি শান্তি চুক্তির পত্র পাঠানো হয়েছিল। যেখানে মোট তিনটি প্রস্তাব রাখা হয়। পত্রের মধ্যে তিনটি প্রস্তাব হল:
- ১. অন্যায়ভাবে নিহত বনু খুযায়ার লোকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
- ২. বনু বকর সম্প্রদায় কে সকল ধরনের সাহায্য প্রদানে বিরত থাকতে হবে।
- ৩. হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তাবলী বাতিল বলে ঘোষিত হবে।
মুহাম্মদ (সা.) এর দূত কুরাইশদের নিকট পত্রটি উপস্থাপন করেন। কুরাইশ নেতারা নবিজির তিনটি প্রস্তাব মানল না এবং তাঁরা হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তাবলী বাতিল বলে ঘোষণা করল।
এরপর, মুহাম্মদ (সা.) কুরাইশ দের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য এবং মক্কা অভিযানের জন্য সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্ৰহণ করলেন।
মুহাম্মদ (সা.) ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের ৬ই জানুয়ারি (১০ই রমজান, অষ্টম হিজরি) তারিখ মক্কার পথে রোওনা দিলেন। মুহাম্মদ (সা.) নের্তৃত্বে ছিল ১০,০০০ মুসলিম যোদ্ধার বিশাল মুসলিম বাহিনী। তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটাই মক্কা বিজয় করা।
মদিনা থেকে মক্কার দিকে ধেয়ে আসছে বিশাল মুসলিম বাহিনী। মক্কার সকল কুরাইশরা মুসলিম বাহিনী কে দেখে কাঁপতে লাগলো থরথর করে।
দিকবেদিক ছুটতে লাগল কুরাইশরা, তাঁরা যেনো দেখে ফেলেছে একটা কেয়ামত। যা শেষ করে দেবে মক্কার জনপদ ও সকল মানুষ কে।
মুহাম্মদ (সা.) মক্কা নগরীর একেবারেই সামনে একটি বিশাল মুসলিম সেনার বাহিনী দাঁড় করালেন। মুসলিম বাহিনীর প্রতিটি যোদ্ধরা যেনো বলতে চাচ্ছেন কে আমাদের মোকাবেলা করবে আসো।
আজ সবকটা কুরাইশী মানুষদের ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করব। আসো তোমরা আমাদের মোকাবেলা কর। তোমরা কতই আমাদের নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছো। এখন শুধু মুসলিমদের রাজত্ব চলবে।
তাঁরা বিশাল সুগঠিত মুসলিম বাহিনী কে দেখে কুরাইশগণ সরাসরি বাধা দিতে ভয় পেল।
কী ঘটতে চলেছে এবং মুসলিম বাহিনী কে দেখতে তাঁদের মধ্য থেকে আবু সুফিয়ান সহ দুইজন অনুচর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এর জন্য বের হলেন এবং মুসলিম বাহিনীর সামনে আসা মাত্রই হযরত (রা) তাদের ধরে ফেললেন।
এরপর, তাদের মুহাম্মদ (সা.) এর নিকট নিয়ে যাওয়া হলে নবীজি আবু সুফিয়ান সহ দুইজন অনুচর কে ক্ষমা করে দেন। তাঁরা আমাদের মায়ার নবীর দয়া দেখে মুহাম্মদ (সা.) এর নিকট ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
এরপর, আসতে আসতে মুহাম্মদ (সা.) ও মুসলিম বাহিনীর সকল যোদ্ধা মক্কা নগরীতে প্রবেশ করলেন। যেখান থেকে একদিন মুহাম্মদ (সা.) কে হিজরত করতে বাধ্য করা হয়েছিল, যে ভূমিতে বেলাল (রা) বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে অবানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল। সেই নগরীতেই মুসলিম বাহিনী বিরত্বের সঙ্গে প্রবেশ করল।
আবু সুফিয়ান মুহাম্মদ (সা.) ও মুসলিম বাহিনী কে সাদর আমন্ত্রণ জানালো।
এরপর, সাফওয়ান, সুহাইল, ইকরামা, এবং মাখযুম গোত্রের লোকেরা মুহাম্মদ (সা.) কে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তাঁদের বাঁধা দেওয়ার আগেই হযরত আব্বাস (রা) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মক্কায় প্রবেশ করলেন।
তিনি কুরাইশদের জন্য সাবধানী বানী উচ্চারণ করে বললেন, মক্কা নগরী কে মুসলিম বাহিনীরা ঘিরে ফেলেছে। মক্কার দক্ষিণ অংশে মুসলিম বাহিনী ও খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) রয়েছেন, উত্তরাংশে অবস্থান করছে জুবাইর এবং পুরো সৈন্যবাহিনী পরিচালনা করছে স্বয়ং আল্লাহর রাসুল। রাসুলের সাথে আছে মুহাজিরিন, আনসার, এবং বনু খুযায়া গোত্র।
মুসলিম বাহিনী কে দেখে আবু সুফিয়ান কুরাইশদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা আত্মসমর্পণ করো। এটাতে তোমাদের জন্য মঙ্গল।
এরপর, মুসলিম বাহিনী মক্কার আরো গভীরে প্রবেশ করতে থাকে। তখন দক্ষিণাংশে খালিদ কে আক্রমণ করে ইকরামার নেতৃত্বে একটি গঠিত কুরাইশ বাহিনী। কিন্তু খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) তাদের আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয়।
সকল বিক্ষিপ্ত বাঁধা কে দূর করে মক্কার কেন্দ্রে পৌঁছে যায় মুসলিম বাহিনী।
আরবের মক্কা নগরী বিজয় হয় দীর্ঘ আট বছর পর এবং রক্তপাতহীন ও প্রায় বিনা বাধায় জয়ী হয় মুসলিমরা।
মক্কা বিজয়ের পর মুহাম্মদ (সা) মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। যদি তিনি চাইতেন তাহলে প্রতিশোধ গ্ৰহণ করতে পারতেন। কিন্তু, এমন কোন কাজ করলেন না।
তিনি মক্কা বাসীর উদ্দেশ্য শুধু বলেছিলেন ১. যে অস্ত্র ত্যাগ করবে তার কোনো ভয় নেই, ২. যে কাবায় প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, ৩. যে নিজেকে গৃহে আবদ্ধ রাখবে সেও নিরাপদ, ৪. যারা আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে তাঁরা ও অভয়প্রাপ্ত।
মক্কা বিজয়ের গল্প থেকে প্রশ্ন ও উত্তর
৮টি ছোট প্রশ্ন ও উত্তর
১. হুদায়বিয়া সন্ধি কত সালে হয়েছিল?
উত্তর: ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে।
২. হুদায়বিয়া সন্ধির মেয়াদ কত বছরের ছিল?
উত্তর: ১০ বছর।
৩. কোন ঘটনার মাধ্যমে সন্ধি ভঙ্গ হয়?
উত্তর: বনু খুযায়া গোত্রের ওপর হামলার মাধ্যমে।
৪. মক্কা অভিযানে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা কত ছিল?
উত্তর: প্রায় ১০,০০০ জন।
৫. মক্কা বিজয় কোন সালে সংঘটিত হয়?
উত্তর: ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে (৮ম হিজরি)।
৬. মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা.) কী ঘোষণা করেন?
উত্তর: সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
৭. মুসলিম বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি কে ছিলেন?
উত্তর: খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.)।
৮. মক্কা বিজয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
উত্তর: ক্ষমা, ন্যায়, শান্তি ও মহানুভবতা।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url