তিন মাছের গল্প: সুবুদ্ধি, কুবুদ্ধি ও বোকা

দূরদর্শিতা, আত্মবিশ্বাস ও ভাগ্যনির্ভরতার এক শিক্ষণীয় উপকথা

অনেক দিন আগে একটি শান্ত ও সুন্দর পুকুরে তিনটি মাছ বাস করত। তারা ছিল খুব ভালো বন্ধু, কিন্তু তাদের চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন ছিল দূরদর্শী ও বুদ্ধিমান, একজন নিজের বুদ্ধির ওপর অতিরিক্ত ভরসা করত, আরেকজন ছিল উদাসীন ও ভাগ্যনির্ভর।

একদিন হঠাৎ তাদের জীবনে এমন একটি বিপদের আভাস দেখা দিল, যা তাদের বুদ্ধি, বিচক্ষণতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার কঠিন পরীক্ষা নিল। বিপদ আসার আগেই কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারল? কে নিজের ভুল আত্মবিশ্বাসের কারণে বিপদে পড়ল? আর কে ভাগ্যের ওপর ভরসা করে সর্বনাশ ডেকে আনল?
তিন মাছের গল্প: সুবুদ্ধি, কুবুদ্ধি ও বোকা
চলুন পড়ি তিন মাছের এই চমৎকার শিক্ষণীয় গল্প, যা আমাদের শেখায়, সময় থাকতে সতর্ক হওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ।

তিন মাছের গল্প

একটি শান্ত, স্বচ্ছ পানির পুকুরে তিনটি মাছ বাস করত। পুকুরটি ছিল শাপলা-শালুকে ভরা, চারপাশে সবুজ গাছপালা আর নানা রকম জলজ প্রাণীর আনাগোনায় মুখর। সেই পুকুরে তিনটি মাছের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। তবে স্বভাব ও চিন্তাভাবনায় তারা ছিল একেবারেই ভিন্ন।

প্রথম মাছটির নাম ছিল সুবুদ্ধি। সে ছিল খুব দূরদর্শী, বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান। যেকোনো কাজ করার আগে সে ভালোভাবে চিন্তা করত এবং সম্ভাব্য বিপদের কথা আগেই অনুমান করতে পারত।

দ্বিতীয় মাছটির নাম ছিল কুবুদ্ধি। সে নিজেকে অনেক চালাক মনে করত, কিন্তু প্রায়ই ভুল সিদ্ধান্ত নিত। অন্যের পরামর্শ শুনতে তার ভালো লাগত না এবং নিজের বুদ্ধির ওপর অতিরিক্ত ভরসা করত।

তৃতীয় মাছটির নাম ছিল বোকা। নামের মতোই সে ছিল সরল-সোজা এবং অল্পবুদ্ধির। কোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবত না, বরং যা ঘটছে তা-ই মেনে নিয়ে নিশ্চিন্তে দিন কাটাত।

এভাবেই তিন মাছ সুখে-শান্তিতে সেই পুকুরে বসবাস করছিল। কিন্তু একদিন এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা তাদের বুদ্ধি, দূরদর্শিতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার সত্যিকারের পরীক্ষা নিয়ে এল।

সন্ধ্যার সময় সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে অস্ত যেতে শুরু করেছে, তখন পুকুরের চারপাশে এক শান্ত পরিবেশ নেমে এসেছিল। ঠিক সেই সময় কয়েকজন জেলে পুকুরের পাড় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। তারা পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে বড় বড় মাছের চলাফেরা দেখে খুব খুশি হলো।

একজন জেলে বলল, "দেখেছিস! এই পুকুরে কত বড় বড় বড় মাছ আছে।"

আরেকজন বলল, "হ্যাঁ, আজ তো সময় নেই। তবে কাল ভোরেই জাল নিয়ে আসব। মনে হচ্ছে একদিনেই অনেক মাছ ধরা যাবে।"

তাদের কথোপকথন কাছেই থাকা সুবুদ্ধি মাছের কানে পৌঁছে গেল। জেলেদের পরিকল্পনার কথা শুনে সে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, আগামীকাল এই পুকুরে থাকলে তাদের জীবন বড় বিপদের মুখে পড়বে।

এক মুহূর্তও দেরি না করে সুবুদ্ধি দ্রুত সাঁতরে তার দুই বন্ধু কুবুদ্ধি ও বোকার কাছে গেল। তার মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট ছিল।

সে বলল, "বন্ধুরা, আমাদের ওপর ভয়ঙ্কর বিপদ আসছে! আমি একটু আগে জেলেদের কথা শুনেছি। তারা কাল ভোরে এই পুকুরে জাল ফেলতে আসবে। যদি আমরা এখানে থাকি, তাহলে নিশ্চিতভাবে ধরা পড়ব।"

কুবুদ্ধি ও বোকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

সুবুদ্ধি আবার বলল, "বিপদ আসার আগেই তার মোকাবিলা করা বুদ্ধিমানের কাজ। এই পুকুরের সঙ্গে একটি সরু খাল দিয়ে বড় নদীর সংযোগ আছে। আজ রাতেই আমরা সেই পথ ধরে নদীতে চলে যাই। নদী অনেক বড়, সেখানে জেলেদের জাল থেকে বাঁচার সুযোগও বেশি। এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে হয়তো আর সুযোগ পাব না।"

সুবুদ্ধির কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর কুবুদ্ধি হালকা হেসে মাথা নাড়ল। তার মুখে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ, যেন কোনো বিপদই তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।

সে বলল, "আরে বন্ধু, তুমি অকারণেই এত ভয় পাচ্ছ। এখনই পুকুর ছেড়ে পালাব কেন? কাল কী হবে, তা তো কেউ জানে না। অনেক সময় মানুষ অনেক কিছু বলে, কিন্তু সব কথা কি সত্যি হয়? জেলেরা হয়তো কাল আর আসবেই না।"

একটু থেমে সে আবার বলল, "আর যদি সত্যিই আসে, তাহলে তখন দেখা যাবে। বিপদ সামনে এলে আমি আমার বুদ্ধি খাটিয়ে কোনো না কোনো উপায় বের করে নেব। আগাম ভয় পেয়ে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া আমার স্বভাবে নেই।"

তার কথা শুনে বোকা মাছও মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল।

কুবুদ্ধি আরও বলল, "এই পুকুরেই তো আমরা জন্মেছি, বড় হয়েছি। কত বছর ধরে এখানে আছি! শুধু কয়েকজন জেলের কথা শুনেই সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়া কি ঠিক হবে? আমি মনে করি, বিপদ আসার আগেই ভয় পাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ।"

সুবুদ্ধি তার বন্ধুর কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানত, অনেক সময় মানুষ বিপদকে ছোট করে দেখে এবং নিজের ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত ভরসা করে। কিন্তু প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো বিপদ মাথার ওপর এসে পড়ার আগে তার থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়া।

তবুও সে শেষবারের মতো বন্ধুদের বোঝানোর চেষ্টা করে বলল, "বন্ধু, বিপদ এলে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা অবশ্যই করতে হয়। কিন্তু যে বিপদ আগেই জানা যায়, তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমানের কাজ। পরে সুযোগ নাও থাকতে পারে।"

কুবুদ্ধির কথা শেষ হতেই বোকা মাছ অলস ভঙ্গিতে পানিতে ভেসে উঠল। তার মুখে কোনো চিন্তার ছাপ ছিল না। যেন আসন্ন বিপদের খবর তার মনে সামান্যতম উদ্বেগও সৃষ্টি করতে পারেনি।

সে হেসে বলল, "ধুর! তোমার দুজন এত চিন্তা করছ কেন? আজ তো কোনো বিপদ আসেনি। আমরা তো এখনো নিরাপদেই আছি। কাল কী হবে, তা নিয়ে আজ থেকেই মাথা ঘামানোর কী দরকার?"

একটু থেমে সে আবার বলল, "আর যদি সত্যিই কাল জেলেরা আসে, তাহলে যা হওয়ার হবে। ভাগ্যে যদি মৃত্যু লেখা থাকে, তাহলে পালিয়ে গিয়েও লাভ নেই। আর যদি বেঁচে থাকার কথা থাকে, তাহলে এখানেই বেঁচে যাব। আমি এসব ভেবে নিজের শান্তি নষ্ট করতে চাই না।"

তার কণ্ঠে ছিল উদাসীনতা আর অদৃষ্টবাদী মনোভাব।

বোকা আরও বলল, "এই পুকুরেই আমার জন্ম, এই পুকুরেই আমি বড় হয়েছি। এই পরিচিত জায়গা ছেড়ে অজানা নদীতে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। যদি সত্যি কাল বিপদ আসে, তাহলে এখানেই তার মুখোমুখি হব। আর যদি মরতেই হয়, তবে নিজের পুকুরেই মরব। আমি কোথাও যাচ্ছি না।"

বন্ধুদের এমন কথা শুনে সুবুদ্ধির মন আরও ভারী হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, আর বোঝানোর চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই। একজন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে অন্ধ, আরেকজন সম্পূর্ণ উদাসীন ও ভাগ্যনির্ভর।

তখন সুবুদ্ধি শান্ত কণ্ঠে বলল, "আমি তোমাদের মঙ্গল চেয়েই পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রত্যেকের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। তোমরা যদি এখানেই থাকতে চাও, তবে থাকো। আমি বিপদ আসার অপেক্ষা করতে রাজি নই।"

সেই রাতেই, চাঁদের মৃদু আলোয় যখন পুকুরের পানি ঝিকমিক করছিল, সুবুদ্ধি পুকুরের সঙ্গে সংযুক্ত সরু খাল ধরে ধীরে ধীরে বড় নদীর দিকে রওনা দিল। যাওয়ার আগে সে একবার পিছন ফিরে তার দুই বন্ধুর দিকে তাকাল। তার মনে কেবল একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল।

"বিপদকে অবহেলা করা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি বিপদ জেনেও সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া আরও বড় ভুল।"

কিন্তু কুবুদ্ধি ও বোকা তখনও নিশ্চিন্ত মনে পুকুরের পানিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তারা জানত না, পরদিন ভোর তাদের জীবনে কী ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসতে চলেছে।

সুবুদ্ধি আর দেরি না করে সেই রাতেই পাশের খাল দিয়ে বড় নদীতে চলে গেল। 

পরদিন সকালে জেলেরা এসে পুকুরে জাল ফেলল। কুবুদ্ধি আর বোকা দুই মাছই ধরা পড়ল। 

সুযোগ পেয়ে কুবুদ্ধি জাল থেকে লাফিয়ে পানিতে পড়ে গেল আর বেঁচে গেল। শুধু জালে ধরা পড়ল বোকা মাছটি। 

বোকা মাছ কোন বুদ্ধি না পেয়ে চুপচাপ ছিল। জেলেরা তাকে ধরে ঝুড়িতে ভরল। সেখানেই তার জীবন শেষ হলো।

গল্পের শিক্ষা (Moral of the story)

সময় থাকতে সাবধান হও। বিপদ দেখেও যে শুধু বর্তমান সময় কে বেশি গুরুত্ব দেয়, তার ধ্বংস অনিবার্য। বরং, বুদ্ধি দিয়ে ভবিষ্যৎ এর বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, বুদ্ধিমান মানুষ বিপদ আসার আগেই ব্যবস্থা নেয়।

আর যে বর্তমান কে বেশি গুরুত্ব দেয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নয় এমন লোক সব সময় বিপদে পড়ে। বিপদে পড়ার পর বুদ্ধি বের করো না, তা কাজে নাও লাগতে পারে। 

তবে, বিপদ দেখে বুদ্ধি করে ব্যবস্থা নিলে অবস্যই জীবন বেঁচে যেতে পারে। যদিও বিপদে পড়ার সম্ভাবনা ১%। 

মনে রাখুন, ঝড় উঠেছে, সুতরাং বৃষ্টি আসবে। যদি বৃষ্টি নাও আসে, তবুও ছাতার ব্যবস্থা আগাম রাখা জরুরি। 

তিন মাছের গল্প থেকে প্রশ্ন ও উত্তর 

১০টি ছোট প্রশ্ন ও উত্তর

১. তিনটি মাছের নাম কী ছিল?

উত্তর: তিনটি মাছের নাম ছিল সুবুদ্ধি, কুবুদ্ধি ও বোকা।

২. সুবুদ্ধি মাছ কেমন ছিল?

উত্তর: সুবুদ্ধি মাছ ছিল দূরদর্শী, বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান।

৩. কুবুদ্ধি মাছের প্রধান দুর্বলতা কী ছিল?

উত্তর: কুবুদ্ধি নিজের বুদ্ধির ওপর অতিরিক্ত ভরসা করত এবং অন্যের পরামর্শ শুনত না।

৪. বোকা মাছের স্বভাব কেমন ছিল?

উত্তর: বোকা মাছ ছিল অলস, সরল এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাহীন।

৫. জেলেরা পুকুরে কেন আসতে চেয়েছিল?

উত্তর: পুকুরে বড় বড় মাছ দেখে জেলেরা মাছ ধরতে আসতে চেয়েছিল।

৬. সুবুদ্ধি মাছ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?

উত্তর: সুবুদ্ধি মাছ বিপদ আসার আগেই খাল দিয়ে নদীতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

৭. কুবুদ্ধি মাছ কেন পুকুর ছাড়েনি?

উত্তর: সে মনে করেছিল বিপদ এলে নিজের বুদ্ধি দিয়ে বাঁচতে পারবে।

৮. বোকা মাছ কেন পুকুরে থেকে গিয়েছিল?

উত্তর: বোকা মাছ ভাগ্যের ওপর নির্ভর করেছিল এবং বিপদকে গুরুত্ব দেয়নি।

৯. জেলেদের জালে কারা ধরা পড়েছিল?

উত্তর: কুবুদ্ধি ও বোকা মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়েছিল।

১০. গল্পের মূল শিক্ষা কী?

উত্তর: বিপদ আসার আগেই সতর্ক হয়ে ব্যবস্থা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

আরো গল্প পড়ুন,





এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url