জোলা ও সাত ভূতের যাদুর গল্প

জোলা আর সাত ভূত: লাঠি দিয়ে যাদুর হাঁড়ি, ছাগল উদার করল জোলা

জোলা ও ৭ ভূতের গল্পটি একটি মজার, ভূতের, এবং নীতিকথা মূলক একটি গল্প। যেখানে জোলা একটি সহজ সরল ছেলে, যে তার প্রিয় বন্ধু হাকিমের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য সাত ভূতের থেকে পাওয়া যাদুর জিনিস গুলো তার মাকে দেখাতে পারিনি। শেষে যাদুর লাঠি নিয়ে গিয়ে হাকিমের থেকে হাঁড়ি ও ছাগল উদ্ধার করে। 
জোলা ও সাত ভূতের যাদুর গল্প

গল্পটি আমাদের সামাজিকতা, বন্ধুত্ব, ভূত, ইত্যাদি থেকে একটা জিনিস শিক্ষা দেয়, তা হল বিশ্বাস। যাইহোক, চলুন গল্লটি পড়ি। 

সরল জোলা ও ভীতু সাত ভূতের গল্প কাহিনী 

অনেক অনেক দিন আগের কথা।‌ এক গ্ৰামে এক বুড়ো মা ও তাঁর ছেলে থাকত। ছেলেটার নাম জোলা।‌ ছেলেটি দেখতে সুন্দর। তবে, ছেলেটির একটু বুদ্ধি কম এবং বোকা সোকা ধরনের একজন যুবক। 

জোলা একবার তার মায়ের কাছে পিঠা খাওয়ার একটি মধুর আবদার করল। জোলা তার মাকে বলল, “মা, আমি তোমাকে দুই দিন থেকে পিঠা বানানোর জন্য বলছি। তুমি কি এখনো আমার জন্য পিঠা বানাবে না? আজ যদি পাঠা না দাও, তাহলে আমি বাড়ি থেকেই চলে যাব।”

তার মা বুঝতে পারলেন ছেলেটির পিঠা খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে। জোলার মা বললেন, “জোলা, তুই বাইরে থেকে ঘুরে আয়। আমি তোমার জন্য পিঠা বানাচ্ছি।”

জোলা তার মায়ের কথা শুনে বাইরে খেলতে গেল। ছোলার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হাকিম। তাকে বলল‌, “হাকিম, আমার মা আমার জন্য পিঠা বানাচ্ছে। আজ আমি অনেক পিঠা খাবো। তুই যদি চাস, তাহলে তোকে ও দুচারটে দিব।”

হাকিম বলল, “জোলা, তুই আমাকে পিঠা দিস। দুজনে একসাথে বসে পিঠা খাবো। 

ঘুরা শেষে জোলা বাড়িতে গেল এবং মায়ের থেকে পিঠা চাইলো। জোলা বলল, “মা, পিঠা কোথায় আমার। আমি বারান্দায় বসে আছি। তাড়াতাড়ি পিঠা দাও।”

জোলার মা ঘর থেকে এক হাঁড়ি পিঠে দিয়ে বলল, “জোলা, এই নে তোর পিঠা। আজ সব পিঠা খেয়ে শেষ করতে হবে।”

জোলা বলল, “ঠিক আছে মা। কিন্তু, এই পিঠা আমি বাড়িতে বসে খাবো না। আমি পিঠা ঘাটে খাবো, মাঠে খাবো, হাকিমের সাথে বসে খাবো। যাই, বাইরে যায়”

জোলা গ্ৰামের মেঠোপথ ধরে হাঁটছিল। চারিদিকে বাতাস বইছে আর জোলা মনের আনন্দে পিঠা খাচ্ছে। 

জোলা পিঠা খাচ্ছে আর বলছে, 

একটা খাবো, দুটো খাবো, সবকটা কে চিবিয়ে খাবো। একটা খাবো, দুটো খাবো, সবকটা কে চিবিয়ে খাবো……

এভাবে ছড়া বলছে আর হাঁটছে। জোলা হাঁটতে হাঁটতে একটি বড় ভূত ওয়ালা গাছের কাছে এলো এবং গাছে ছিল সাতটি ভূত। 

জোলার ছড়া বলা শুনে ভূত গুলো মনে করল। ছেলেটি মনে হয়, তাদের চিবিয়ে খাবো। সাতটি ভূতই ভয় পেয়ে গেল এবং গাছ থেকে সব ভূত গুলো নেমে জোলার সামনে এসে দাঁড়ালো এবং বলল “ওস্তাদ আমাদের খাবেন না। আমরা নিরিহ ভূত। আমরা তো আপনার কোন ক্ষতি করিনি। আমাদের চিবিয়ে খাবেন না।”

সাতটি ভূত আরো বলল, “ওস্তাদ এই নিন হাড়ি।”

জোলা হাড়ি দেখে বলল, “আমি হাড়ি নিয়ে কি করব? আমার বাড়িতে তো হাঁড়ির কোনো অভাব নেই।”

সাতটি ভূত বলল, “এটা কোন সাধারণ হাড়ি নয়। হাঁড়িটি হল যাদুর হাঁড়ি। আপনি যা খেতে চান, তা হাঁড়ি কাছে গিয়ে বলুন, হাঁড়িতে আপনার পছন্দের খাবারটি চলে আসবে।”

জোলা হাঁড়িটি সত্যি খাবার দিতে পারি কি না, তা দেখার জন্য হাঁড়ির কাছে গিয়ে বলল, “আমি পায়েস খেতে চাই।” হাঁড়ি থেকে সত্যি সত্যি পায়েস তৈরি হলো এবং জোলা পায়েস খেলো। 

ভূতের কাছে থেকে জোলা চলে গেল। জোলা নিজের বাড়ি না গিয়ে তার বন্ধু হাকিমের বাড়িতে গেল এবং তাকে জাদুর হাড়ি দেখালো। 

জোলা হাকিম কে যাদুর হাঁড়ির রাবড়ি খাওলো এবং জোলার বন্ধু হাকিমের হাঁড়ির প্রতি লোভ হল এবং হাঁড়ি চুরি করার পরিকল্পনা করল। 

হাকিম বলল, “জোলা, তুমি অনেক দূর থেকে এসেছো। তুমি বিশ্রাম নাও।” 

জোলার বিশ্রামের সময় হাকিম যাদুর হাঁড়ি নিয়ে লুকিয়ে রাখলো। 

জোলার যখন বিশ্রাম নেওয়া শেষ হল। তখন জোলা বাড়ি যেতে চাইলো এবং হাকিম নকল হাঁড়ি নিয়ে জোলা কে দিল এবং জোলা বাড়িতে চলে গেল। 

জোলা নকল হাঁড়ি নিয়ে বাড়ি চলে গেল এবং তার মাকে তাঁর যাদুর হাঁড়ি দেখাতে গেল। জোলা বলল, “মা, মা… আমি এক আশ্চর্যজনক হাঁড়ি পেয়েছি। হাঁড়ির কাছে গিয়ে তুমি যা চাইবে, তাই হাড়িটি তোমাকে তৈরি করে খাওয়াবে।”

জোলা তার মাকে পায়েস খাওয়ানোর জন্য হাঁড়ি কাছে গিয়ে বলল, “আমি পায়েস খেতে চাই।” কিন্তু, দুঃখের বিষয় হাঁড়ি পায়েস দিল না। এভাবে দুই থেকে তিন বার চেষ্টা করল এবং জোলা রেগে গিয়ে বলল, “ভূত কে আজ আমি আসলেই চিবিয়ে খাবো। আমাকে নকল হাঁড়ি দিয়ে ঠকানো হয়েছে।”
 
রেগে গিয়ে গাছের কাছে গিয়ে উচ্চস্বরে বলল

একটা খাবো, দুটো খাবো, সবকটা কে চিবিয়ে খাবো। একটা খাবো, দুটো খাবো, সবকটা কে চিবিয়ে খাবো……

জোলার কথা শুনে সাত ভূত আবার ভয় পেল এবং গাছে থেকে নেমে গিয়ে বলল, “ওস্তাদ আবার কি হল, আপনাকে তো একটি যাদুর হাঁড়ি দিলাম আরো কি চাই।”

জোলা রেখে গিয়ে বলল, “তোমাদের হাঁড়িতে কোন খাবার পেলাম না, এটা নকল হাঁড়ি।”

ভূত গুলো সব মেনে নিল এবং সোনার মোহর দেয় এমন একটি ছাগল দিল। জোলা খুব খুশি হল এবং ছাগল দেখাতে তার প্রিয় বন্ধু হাকিমের কাছে গেল।‌

হাকিম জোলার সাথে আবার বিশ্বাসঘাতকতা করল এবং যাদুর ছাগলের বদলে একটি নকল ও সাধারণ ছাগল দিয়ে জোলা কে বাড়ি ফেরত পাঠালো। 

জোলা তো মহাখুশি। সে তার মাকে বলল, “আমি একটি যাদুর ছাগল পেয়েছি, ছাগলটি সোনার মোহর দেয়।”

জোলা তার মাকে ছাগলটি দেখালো এবং ছাগলটিকে সুরসুরি দিয়ে সোনার মোহর বের করার চেষ্টা করল।‌ কিন্তু, দুঃখের বিষয় ছাগল সোনার মোহর দিল না।

তার মা এই পাগলামো দেখে বলল, তোর কোন জিনিসই ঠিক ভাবে কোন জিনিস দেয় না। জোলার মা রেগে গেল এবং ঘরের ভিতর চলে গেল। 

জোলা অনেক বেশি রাগ হল সে ভূতের কাছে তৃতীয় বারের মত গেল এবং আগের সেই ছড়াটি বলত লাগলো। 

একটা খাবো, দুটো খাবো, সবকটা কে চিবিয়ে খাবো। একটা খাবো, দুটো খাবো, সবকটা কে চিবিয়ে খাবো……

আবার ভূতেরা সবাই ভয় পেয়ে গেল এবং গাছ থেকে নেমে বলল, “ওস্তাদ, আবার কি হল। এখনো কি আপনি খুশি নন।”

জোলা বলল, “তুমি যে যাদুর হাঁড়ি দিলে সেটাও কিছু তৈরি করে দিলো না, আবার তুমি যে যাদুর ছাগল দিলে সেটাও সোনার মোহর দিল না। তোমাদের কোন জিনিস ভালো নয় এবং কাজের নয়।”

সাত ভূতের মধ্যে থেকে একজন বলল, “আচ্ছা, ওস্তাদ আমাদের কোন কিছুই নকল নয়, সব যাদুর। সব কাজ করে। আপনি বলুন তো হাঁড়ি ও ছাগল পাওয়ার পর কোথায় গিয়েছিলেন?”

জোলা সব কথা শুনে বলল, “আমি হাঁড়ি ও ছাগল নিয়ে সরাসরি বাড়িতে না গিয়ে আমার বন্ধু হাকিমের বাড়িতে গিয়েছিলাম। 

সাত জন ভূতের মধ্যে একজন বলল, “তাহলে আপনার বন্ধু আপনার আসল ও যাদুর হাঁড়ি, ছাগল নিয়েছে। এই নিন ওস্তাদ যাদুর লাঠি এটা দিয়ে আপনি আপনার সব জিনিস ফেরত পাবেন। শুধু বলবেন, “মজা দেখাও”
লাঠি তার কাজ করবে। আর “থামো” বললেই লাঠি থেমে যাবে। 

সরল জোলা খুবই উদ্দীপনা নিয়ে হাকিমের বাড়িতে গেল এবং হাকিম কে ডেকে বলল, “বন্ধু, তুমি কি মজা দেখতে চাও।”

হাকিম বলল, “হ্যাঁ, আমি মজা দেখতে চাই। তবে, এটা কি ধরনের মজা আমাকে বলো।”

জোলা বলল, “আচ্ছা বন্ধু, চলো তোমাকে মজা দেখায়।” জোলা তার যাদুর লাঠি মুখের সামনে ধরল এবং বলল, “মজা দেখাও। 

আর লাঠি হাকিম কে অনেক মারল এবং হাকিম বুঝতে পারল, সে তার বন্ধু জোলার হাঁড়ি ও ছাগল নেওয়ার কারণে এতো মার অনুভব করছে। হাকিম বলল, “বন্ধু আমি তোমার হাঁড়ি ও ছাগল দিচ্ছি। একটু দাঁড়াও। 

হাকিম তার ঘরে দ্রুত গেল এবং জোলার কাছ থেকে চুরি করা যাদুর হাঁড়ি ও ছাগল ফেরত দিল। 

জোলা খুব আনন্দের সাথে বাড়ি পৌঁছালো এবং তার মাকে তার যাদুর হাঁড়ি ও ছাগল দেখালো এবং সাথে অলৌকিক যাদুর লাঠি ও দেখালো। 

জোলার জীবন খুব সুখে অতিবাহিত হতে লাগল। সে অনেক ধনী হল এবং এখানেই জোলা ও সাত ভূতের কান্ড শেষ হল। 

গল্পের শিক্ষা (Moral of the story) 

বিশ্বাস যে কোন শক্তিশালী প্রাণী কে একটি ভীতু প্রাণীতে পরিণত করতে পারে, গল্পে ভূত গুলো অনেক শক্তিশালী হওয়ার পর তারা জোলার ছড়া বলায় অনেক ভয় পাই এবং বিশ্বাস করে নেয় যে, জোলা আসলেই তাদের সাত ভূত কে চিবিয়ে খাবে। 

এছাড়াও, জোলা ও সাত ভূতের গল্প থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় বন্ধুরা কতটা বিশ্বাসঘাতক হয়। হাকিম ছিল জোলার প্রিয় বন্ধু। কিন্তু, হাকিম জোলার থেকে চুরি করে যাদুর হাঁড়ি ও ছাগল নিয়ে নেয়। 

শেষ কথা: আমাদের সবচেয়ে ভালো এবং বুদ্ধিমানের কাজ হল কোন কিছু কে সহজে বিশ্বাস না করা।‌ অবস্যই বুঝেশুনে বিশ্বাস করতে হবে। 

মনে রাখা উচিত, বন্ধুদের কাছে নিজের প্রিয় এবং পছন্দের জিনিস না দেখানো। আপনার সকল জিনিস গোপন করা উচিত সকল বন্ধুদের থেকে। কারণ, তারা আপনার কখনোই ভালো চাই না। সব সময় তারা চাই আপনার ক্ষতি হোক।‌

জোলা ও সাত ভূতের গল্প থেকে ছোট প্রশ্ন ও উত্তর

১০টি ছোট প্রশ্ন ও উত্তর

১. প্রশ্ন: জোলার সঙ্গে কে থাকত?

উত্তর: তার বুড়ো মা।

২. প্রশ্ন: জোলা মায়ের কাছে কী খেতে চেয়েছিল?

উত্তর: পিঠা।

৩. প্রশ্ন: জোলার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর নাম কী ছিল?

উত্তর: হাকিম।

৪. প্রশ্ন: গাছে কতটি ভূত ছিল?

উত্তর: সাতটি ভূত।

৫. প্রশ্ন: ভূতেরা প্রথমে জোলাকে কী দিয়েছিল?

উত্তর: একটি যাদুর হাঁড়ি।

৬. প্রশ্ন: যাদুর হাঁড়ির বিশেষ ক্ষমতা কী ছিল?

উত্তর: যা চাইবে, তাই খাবার তৈরি করে দিত।

৭. প্রশ্ন: হাকিম জোলার সঙ্গে কী করেছিল?

উত্তর: যাদুর জিনিস চুরি করে নকল জিনিস দিয়েছিল।

৮. প্রশ্ন: ভূতেরা দ্বিতীয়বার জোলাকে কী দিয়েছিল?

উত্তর: সোনার মোহর দেওয়া একটি যাদুর ছাগল।

৯. প্রশ্ন: ভূতেরা তৃতীয়বার জোলাকে কী দিয়েছিল?

উত্তর: একটি যাদুর লাঠি।

১০. প্রশ্ন: গল্পের মূল শিক্ষা কী?

উত্তর: কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয় এবং সততা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ।

আরো গল্প পড়ুন,




এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url