আরবি গল্প: সততার পুরস্কার লেখক মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ
আরব দেশের সততার পুরস্কার গল্প
“সততার পুরস্কার” একটি শিক্ষামূলক আরবি লোকগল্প, যা বাংলায় জনপ্রিয়ভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। এই গল্পে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের পরীক্ষা নেওয়ার একটি দারুণ ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে তিনজন ভিন্ন অবস্থার মানুষের চরিত্র, লোভ, কৃতজ্ঞতা আর সত্যবাদিতা যাচাই করা হয়।
গল্পের মূল বার্তা খুব সোজা কিন্তু শক্তিশালী—মানুষ বিপদ থেকে মুক্তি পেলে কি সে সত্য কথা মনে রাখে, নাকি সব ভুলে গিয়ে কৃত্রিম অহংকারে ডুবে যায়? আর ঠিক এখানেই প্রকাশ পায় সততার আসল মূল্য।
এই গল্প শুধু ধর্মীয় শিক্ষা না, বরং বাস্তব জীবনের জন্যও একটা বড় সতর্কবার্তা। সাফল্য পেলে মানুষ কতটা বদলে যায়, সেটাই এই গল্পের মূল বার্তা মানুষ এর কাছে পৌঁছানো।
সততার পুরস্কার গল্প
সেকালে আরব দেশে তিনটি লোক ছিল— একজনের সর্বাঙ্গে ধবল, একজনের মাথায় টাক, আরেকজনের দুই চোখ অন্ধ। আল্লাহ তাহাদের পরীক্ষার জন্য এক ফেরেশতা পাঠাইলেন। ফেরেশতা হইলেন আল্লাহর দূত। তাহারা নূরের তৈয়ারী। এমনি কেহ তাহাদিগকে দেখিতে পায় না। আল্লাহর হুকুমে তাহারা সকল কাজ করিয়া থাকেন।
ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরিয়া প্রথমে ধবলরোগীর নিকটে আসিলেন। তিনি তাহাকে বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাসো?
ধবলরোগী বলিল, আহা! আমার গায়ের রং যদি ভালো হয়। সকলে যে আমাকে বড় ঘৃণা করে।
স্বর্গীয় দূত তাহার গায়ে হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার রোগ সারিয়া গেল। তাহার গায়ের চামড়া ভালো হইল।
তারপর আল্লাহর দূত পুনরায় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এখন তুমি কী চাও?
সে বলিল, আমি উট চাই।
দূত তাহাকে একটি গাভিন উট দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে।
তারপর সেই ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে গিয়া বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাসো?
সে বলিল, আহা! আমার এই রোগ যদি সারিয়া যায়। যদি আমার মাথায় চুল উঠে!
আল্লাহর দূত তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার টাক সারিয়া গেল। তাহার মাথায় চুল গজাইল। দূত পুনরায় বলিলেন, এখন তুমি কী চাও?
সে বলিল, গাভি।
তিনি তাহাকে একটি গাভিন গাই দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে।
তারপর স্বর্গীয় দূত অন্ধের কাছে গেলেন। গিয়া বলিলেন, কী তুমি সবচেয়ে ভালোবাসো?
সে বলিল, আল্লাহ আমার চোখ ভালো করিয়া দিন। আমি যেন লোকের মুখ দেখিতে পাই।
স্বর্গীয় দূত তাহার চোখে হাত বুলাইয়া দিলেন। তাহার চোখ ভালো হইয়া গেল।
তারপর তিনি তাহাকে বলিলেন, এখন তুমি কী চাও?
সে বলিল, আমি ছাগল চাই।
স্বর্গীয় দূত তাহাকে একটি গাভিন ছাগল দিয়া বলিলেন, এই লও। ইহাতে তোমার ভাগ্য খুলিবে।
তারপর উটের বাচ্চা হইল, গাভির বাছুর হইল, ছাগলের ছানা হইল। এই রকম করিয়া উটে, গাভিতে, ছাগলে তাহাদের মাঠ বোঝাই হইয়া গেল।
কিছুদিন পর আবার সেই ফেরেশতা পূর্বের মতো মানুষের রূপ ধরিয়া, সেই যে আগের ধবলরোগী ছিল, তাহার নিকট উপস্থিত হইলেন।
সেখানে গিয়া তিনি বলিলেন, আমি এক বিদেশি। বিদেশে আসিয়া আমার সব পুঁজি ফুরাইয়া গিয়াছে। এখন আল্লাহর দয়া ছাড়া আমার আর দেশে ফিরিবার উপায় নাই। যিনি তোমারে সুন্দর গায়ের রং দিয়াছেন, সুন্দর চামড়া দিয়াছেন, আর এত ধনদৌলত দিয়াছেন, তাঁহার দোহাই দিয়া তোমার কাছে একটি উট চাহিতেছি।
সে বলিল, উটের অনেক দাম, কী করিয়া দিই?
স্বর্গীয় দূত বলিলেন, ওহে! আমি যেন তোমাকে চিনিতে পারিতেছি। তুমি না ধবলরোগী ছিলে, আর সকলে তোমাকে ঘৃণা করিত? তুমি না গরিব ছিলে, পরে আল্লাহ তোমাকে ধনদৌলত দিয়াছেন?
সে বলিল, না, তা কেন? এসব তো আমার বরাবরই আছে।
স্বর্গীয় দূত বলিলেন, আচ্ছা! যদি তুমি মিথ্যা বলিয়া থাক, তবে তুমি যেমন ছিলে আল্লাহ আবার তোমাকে তাহাই করিবেন।
তারপর স্বর্গীয় দূত পূর্বে যে টাকওয়ালা ছিল, তাহার কাছে গেলেন। সেখানে গিয়া আগের মতো একটি গাভি চাহিলেন। সেও ধবলরোগীর মতো তাহাকে কিছুই দিল না। তখন স্বর্গীয় দূত বলিলেন, আচ্ছা, যদি তুমি মিথ্যা কথা বলিয়া থাক, তবে যেমন ছিলে আল্লাহ তোমাকে আবার তেমনি করিবেন।
তারপর স্বর্গীয় দূত পূর্বে যে অন্ধ ছিল, তাহার কাছে গিয়া বলিলেন, আমি এক বিদেশি। বিদেশে আমার সম্বল ফুরাইয়া গিয়াছে। এখন আল্লাহর দয়া ছাড়া আমার দেশে পৌঁছিবার আর কোনো উপায় নাই। যিনি তোমার চক্ষু ভালো করিয়া দিয়াছেন, আমি তোমাকে সেই আল্লাহর দোহাই দিয়া একটি ছাগল চাহিতেছি। যেন আমি সেই ছাগল-বেচা টাকা দিয়া দেশে ফিরিয়া যাইতে পারি।
তখন সে বলিল, হ্যাঁ ঠিক তো। আমি অন্ধ ছিলাম, পরে আল্লাহ আমাকে দেখিবার ক্ষমতা দিয়াছেন। আমি গরিব ছিলাম, তিনি আমাকে আমির করিয়াছেন। তুমি যাহা চাও লও। আল্লাহর কসম, আল্লাহর উদ্দেশ্যে যে জিনিস লইতে তোমার মন চায়, তাহা যদি তুমি না লও, তবে আমি তোমাকে কিছুতেই ভালো লোক বলিব না।
ফেরেশতা তখন বলিলেন, বাস্। তোমার জিনিস তোমারই থাক। তোমাদের পরীক্ষা লওয়া হইল। আল্লাহ তোমার উপর খুশি হইয়াছেন, আর তাহাদের উপর বেজার হইয়াছেন।
গল্পের মূলভাব: সততার পুরস্কার
“সততার পুরস্কার” গল্পে দেখানো হয়েছে যে, মানুষ যখন বিপদে থাকে তখন সে আল্লাহর কাছে সাহায্য চায় এবং কৃতজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বিপদ কেটে গেলে অনেকেই সেই কৃতজ্ঞতা ভুলে যায় এবং সত্য অস্বীকার করে।
গল্পে তিনজন মানুষকে আল্লাহ ধন-সম্পদ ও সুস্থতা দিয়ে পরীক্ষা করেন। পরে একজন ফেরেশতা ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে তাদের কাছে সাহায্য চাইলে দুইজন আগের অনুগ্রহ অস্বীকার করে এবং কৃতজ্ঞতা দেখায় না। কিন্তু অন্ধ ব্যক্তি সত্য স্বীকার করে এবং কৃতজ্ঞ থাকে।
শেষে বোঝানো হয়েছে যে, আল্লাহ সততা ও কৃতজ্ঞতার মানুষকে পুরস্কৃত করেন এবং মিথ্যা ও অকৃতজ্ঞদের শাস্তি দেন। এই গল্পের মূল শিক্ষা হলো—সততা, কৃতজ্ঞতা এবং সত্যবাদিতা মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।
ছোট প্রশ্ন (উত্তরসহ): সততার পুরস্কার
১০টি গুরুত্বপূর্ণ ও ছোট প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়া হল:
১. গল্পে মোট কতজন লোক ছিল?
উঃ তিনজন লোক ছিল।
২. তাদের কী কী শারীরিক সমস্যা ছিল?
উঃ একজন ধবলরোগী, একজন টাকওয়ালা, একজন অন্ধ ছিল।
৩. আল্লাহ তাদের কাছে কাকে পাঠিয়েছিলেন?
উঃ আল্লাহ তাদের কাছে ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন।
৪. প্রথম ব্যক্তি কী রোগ থেকে মুক্তি চেয়েছিল?
উঃ ধবলরোগী তার রোগ থেকে মুক্তি চেয়েছিল।
৫. টাকওয়ালা ব্যক্তি কী চাইলো?
উঃ সে চুল ফিরে পেতে চেয়েছিল।
৬. অন্ধ ব্যক্তি কী চাইলো?
উঃ সে চোখের দৃষ্টি ফিরে পেতে চেয়েছিল।
৭. ফেরেশতা তাদের কী দিয়ে সাহায্য করেছিলেন?
উঃ তাদের উট, গাভি ও ছাগল দিয়েছিলেন।
৮. দ্বিতীয়বার ফেরেশতা কেন তাদের পরীক্ষা নিতে আসেন?
উঃ তাদের কৃতজ্ঞতা ও সততা যাচাই করতে আসেন।
৯. কে সত্য কথা স্বীকার করেছিল?
উঃ অন্ধ ব্যক্তি সত্য স্বীকার করেছিল।
১০. গল্পের মূল শিক্ষা কী?
উঃ সততা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য এবং মিথ্যা শাস্তিযোগ্য।
আরো গল্প পড়ুন,

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url