সময়ের মূল্য‌ গল্প - সময়ানুবর্তিতার গল্প

প্রতিটি মুহূর্তের সঠিক ব্যবহার করা - সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। 

সময়ের মূল্য বোঝা জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। যে শিশু ছোটবেলা থেকেই সময়ের সঠিক ব্যবহার, সময়ানুবর্তিতা, পরিকল্পনা এবং পরিশ্রম শিখে, সে ভবিষ্যতে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। 

সময় এমন একটি সম্পদ, যা একবার চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসে না। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো, সুযোগের সদ্ব্যবহার করা এবং অলসতা থেকে দূরে থাকা আমাদের সবার দায়িত্ব। 

সময়ের মূল্য‌ - এক ছেলে পড়াশোনা করছে

আজকের গল্পটি একটি ছোট ছেলের জীবনের মাধ্যমে শেখাবে, কেন সময়ের মূল্য বুঝে জীবন অতিবাহিত করা প্রত্যেক মানুষের জন্য অপরিহার্য। চলুন গল্লটি পড়ি। 

সময়ের মূল্য 

সবুজপুর গ্রামের এক পরিশ্রমী কৃষকের ছেলে ছিল রাহিম। সে ছিল বুদ্ধিমান, কিন্তু একটি বড় সমস্যা ছিল। 

রাহিম সব কাজ পরে করার অভ্যাস গড়ে তুলেছিল। যে কাজ করতে যায়, সে বলে পরে করবে। 

“পড়াশোনা, খেলাধুলা, এমনকি বাবা-মায়ের ছোটখাটো কাজেও সে বলত, "পরে করব।"

তার বাবা প্রতিদিন ভোরে উঠে মাঠে কৃষি কাজ করতে যেতেন। তিনি বলতেন, "সময়কে যে সম্মান করে, সময়ও তাকে সম্মান করে।"

রাহিম বাবার কথা শুনত, কিন্তু গুরুত্ব দিত না। সে বুঝত না, চোখের প্রতিটি পলক কয়েক সেকেন্ড অতিবাহিত হয়ে যায়, যা কখনোই ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 

রাহিম গ্রামের একটি স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। সে নিয়মিত স্কুলে যায়, সবার সাথে খেলাধুলা, পড়াশোনা, আর বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক কাজ করে। 

একদিন গ্রামের স্কুলে রাহিমের শিক্ষক ঘোষণা করল, “এক মাস পরে মেধা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষক সবাইকে বললেন, "আজ থেকেই সবাই প্রস্তুতি শুরু করো। কারণ, যে শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতার আগে সময়ের কাজ সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি নেই, সে মেধা প্রতিযোগিতায় প্রথম হবে।"

রাহিম ভাবল, "এখন তো অনেক সময় বাকি। পরে মেধা প্রতিযোগিতার জন্য পড়ব।"

কিন্তু, তার বন্ধু হাসান প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পড়তে বসত। সে জানত, প্রতিটি মুহূর্ত ভবিষ্যতের জন্য মূল্যবান। সময় এর কাজ সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করলে প্রতিযোগিতা সহজ হয়। সেটা হোক পড়াশোনা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বা চাকরি। 

দিন যেতে লাগল। এক একটি দিন পেরিয়ে যাচ্ছিল। এভাবে, দিন থেকে সপ্তাহ এবং চার সপ্তাহ পর প্রতিযোগিতার দিনটি চলে এলো। 

কিন্তু রাহিম খেলাধুলা আর অলসতায় দিন কাটাচ্ছিল। মাঝে মাঝে বই খুললেও বেশিক্ষণ মনোযোগ দিত না। সে বলত, "প্রতিযোগিতার কয়েকদিন আগে পড়লেই হবে।”

প্রতিদিন সন্ধ্যায় তার বাবা বলতেন, "আজকের দিনটা যদি নষ্ট করো, আগামীকাল আফসোস করতে হবে। কারণ, সময়ের কাজ সময়ে না করলে পরে ঐ কাজটি অনেক ভারী হয়ে যায় এবং প্রস্তুতি ভালো হয় না।"

রাহিম তখনও বিষয়টি বুঝতে পারল না।

দেখতে দেখতে প্রতিযোগিতার আর মাত্র তিন দিন বাকি। তখন সে বুঝল, অনেক পড়া বাকি রয়েছে। সে রাত জেগে পড়তে শুরু করল। কিন্তু এত অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু শেখা সম্ভব হলো না।

অন্যদিকে হাসান প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়েছিল। সে প্রতিটি মূল্যবান সময় কাজে লাগিয়েছিল। ফলে তার কোনো চাপ ছিল না। 

প্রতিযোগিতার দিন এলো। নির্ধারিত সঠিক সময়ে সবাই স্কুলে উপস্থিত হলো। মেধা প্রতিযোগিতায় রাহিম অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না। কিন্তু হাসান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সব প্রশ্নের উত্তর লিখল।

ফল প্রকাশের দিন হাসান প্রথম হলো। রাহিম প্রথম, দ্বিতীয় , তৃতীয় কোনো অবস্থান তৈরি করতে পারল না। সে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরল।

বাবা তাকে বকাঝকা করলেন না। বরং উঠোনে নিয়ে একটি আমগাছ দেখিয়ে বললেন,

"এই গাছটি আজ বড় হয়েছে কারণ আমরা সঠিক সময়-এ চারা রোপণ করেছিলাম, নিয়মিত পানি দিয়েছিলাম এবং যত্ন নিয়েছিলাম। যদি সব কাজ দেরিতে করতাম, তাহলে আজ এই ফল পেতাম না।"

রাহিম চুপচাপ বাবার কথা শুনল।

সে বুঝতে পারল, জীবনের প্রতিটি জীবনক্ষণ খুবই মূল্যবান। হারিয়ে যাওয়া সময় আর কখনো ফিরে আসে না।

পরের বছর সে নিজের অভ্যাস বদলে ফেলল। প্রতিদিন নির্দিষ্ট অবসর সময়ে খেলত, নির্দিষ্ট সময়ে পড়ত এবং পরিবারের কাজেও সাহায্য করত। সে সময় সচেতনতা ও সময়ানুবর্তিতাকে নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে নিল।

এক বছর পরে আবার একই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলো।

এবার রাহিম প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগিয়েছিল। নিয়মিত পড়াশোনা করেছিল। পরীক্ষার হলে সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর লিখল।

ফল প্রকাশের দিন দেখা গেল, এবার রাহিমই প্রথম হয়েছে।

পুরস্কার গ্রহণের সময় শিক্ষক বললেন, "সফলতা শুধু মেধার কারণে আসে না। সময়ের মূল্য বুঝে নিয়মিত পরিশ্রম করলেই সত্যিকারের সাফল্য অর্জন করা যায়। রাহিম কে দেখো, এবার প্রথম হয়েছে, কিন্তু এর আগে সে কোনো অবস্থান অর্জন করতে পারিনি।"

রাহিম হাসিমুখে বাবার দিকে তাকাল। বাবা মৃদু হেসে বললেন,

"আজ তুমি শুধু পুরস্কার জেতোনি, সময়ের আসল মূল্য পেয়ে গেছো। এই অর্জন, এই পুরস্কার, আজকের এই মূহূর্ত শুধুই তোমার"

সেদিন থেকে রাহিম আর কখনো কোনো কাজ ফেলে রাখেনি। সময়ের কাজ সময়ে করত, খুব অল্প অল্প করে কাজ গুলো শেষ করত। 

নীতিকথা

সময় পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। যে সময়ের মূল্য বোঝে এবং প্রতিটি মুহূর্ত সঠিকভাবে কাজে লাগায়, সফলতা একদিন তার কাছেই আসে। 

সফলতা কোনো হাতের মোয়া নয় যে, চাইলেন আর পেয়ে গেলেন। সফলতা পেতে হলে নিয়মিত কাজ এবং সময়ের কাজ সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। 

"আজ নয় কাল করব, আরো অনেক দিন সময় আছে, পরে করব, পরীক্ষার আগের রাতে সারা রাত জেগে প্রস্তুতি নিব” - এই সকল কথা বলা ও চিন্তা করা বাদ দিন। সফলতা নিশ্চিত তোমার হাতের মুঠোয় ধরা দেবে।

সময়ের মূল্য‌ গল্প থেকে প্রশ্ন ও উত্তর 

১০টি ছোট প্রশ্ন ও উত্তর

১. সময়ের মূল্য কী?

উঃ সময়ের মূল্য হলো প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা।

২. গল্পের প্রধান চরিত্র কে?

উঃ রাহিম।

৩. রাহিমের সবচেয়ে বড় ভুল কী ছিল?

উঃ সব কাজ পরে করার অভ্যাস।

৪. হাসান কেন সফল হয়েছিল?

উঃ সে নিয়মিত পড়াশোনা করত এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার করত।

৫. রাহিমের বাবা কী শিক্ষা দিয়েছিলেন?

উঃ সময়কে সম্মান করলে সময়ও মানুষকে সফল করে।

৬. গল্পের মূল শিক্ষা কী?

উঃ সময় নষ্ট না করে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা উচিত।

৭. শিশুদের জন্য সময়ের গুরুত্ব কেন বেশি?

উঃ ছোটবেলার ভালো অভ্যাস ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে।

৮. সময়ানুবর্তিতা কী?

উঃ সঠিক সময়ে কাজ সম্পন্ন করার অভ্যাস।

৯. সময় নষ্ট করলে কী ক্ষতি হয়?

উঃ সুযোগ হারাতে হয় এবং পরে আফসোস করতে হয়।

১০. গল্পটি কারা পড়তে পারে?

উঃ শিশু, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক সবাই।

আরো গল্প পড়ুন,

১. সততার পুরস্কার গল্প 

২. হারজিতের গল্প 

৩. ঘাসফড়িং ও পিঁপড়ার গল্প - ছোট্ট পিঁপড়ের অধ্যবসায়





এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url