বাঘখেকো শিয়ালের ছানার গল্প - একটি মজার ও শিক্ষণীয় গল্প।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর রচিত ‘বাঘখেকো শিয়ালের ছানা’ গল্প
বাংলা শিশু সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর রচিত ‘বাঘখেকো শিয়ালের ছানা’ একটি মজার ও শিক্ষণীয় গল্প।
গল্পটিতে দেখা যায়, এক শিয়াল ও শিয়ালনী তাদের ছানাদের রক্ষা করার জন্য বুদ্ধি ও কৌশলের আশ্রয় নেয়। তাদের উপস্থিত বুদ্ধির কাছে শক্তিশালী বাঘও পরাজিত হয়।
হাস্যরস ও চাতুর্যে ভরা এই গল্পটি শিশুদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি শেখায় যে বিপদের সময়ে বুদ্ধি ও সাহসই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।
বাঘখেকো শিয়ালের ছানার গল্প
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
এক শিয়াল আর এক শিয়ালনী ছিল। তাদের তিনটি ছানা ছিল, কিন্তু থাকার জায়গা ছিল না।
তারা ভাবল, ছানাগুলোকে এখন কোথায় রাখি? একটা গর্ত না হলে তো এরা বৃষ্টিতে ভিজে মারা যাবে। তখন তারা অনেক খুঁজে একটা গর্ত বার করল। কিন্তু গর্তের চারধারে দেখল, খালি বাঘের পায়ের দাগ! তা দেখে শিয়ালনী বলল, 'ওগো, এটা যে বাঘের গর্ত! এর ভিতরে কী করে থাকব?'
শিয়াল বলল, 'এত খুঁজেও তো আর গর্ত পাওয়া গেল না। এখানেই থাকতে হবে!'
শিয়ালনী বলল, 'বাঘ যদি আসে তখন কী হবে?'
শিয়াল বলল, 'তখন তুমি খুব করে ছানাগুলোর গায়ে চিমটি কাটবে। তাতে তারা চেঁচাবে। আর আমি জিজ্ঞেস করব- ওরা কাঁদছে কেন? তখন তুমি বলবে- ওরা বাঘ খেতে চায়।'
তা শুনে শিয়ালনী বলল, 'বুঝেছি। আচ্ছা, বেশ!' বলেই সে খুব খুশি হয়ে গর্তের ভিতরে ঢুকল। তখন থেকে তারা সেই গর্তের ভিতরেই থাকে।
এমনি করে কিছু দিন যায়। শেষে একদিন তারা দেখল যে ওই বাঘ আসছে। অমনি শিয়ালনী তার ছানাগুলোকে ধরে খুব চিমটি কাটতে লাগল। তখন ছানাগুলো চেঁচাতে শুরু করল।
শিয়াল তখন খুব মোটা আর বিশ্রী গলার সুর করে জিজ্ঞেস করল, 'খোকারা কাঁদছে কেন?'
শিয়ালনী তেমনি বিশ্রী সুরে বলল, 'ওরা বাঘ খেতে চায়। তাই কাঁদছে।'
বাঘ তার গর্তের দিকে আসছিল। এর মধ্যে 'ওরা বাঘ খেতে চায়' শুনে সে থমকে দাঁড়াল। সে ভাবল, 'বাবা! আমার গর্তের ভিতর না জানি ওগুলো কী ঢুকে রয়েছে। নিশ্চয় ভয়ানক রাক্ষস হবে, নইলে কি ওদের খোকারা বাঘ খেতে চায়!'
তখুনি শিয়াল বলল, 'আর বাঘ কোথায় পাব? যা ছিল সবই তো ধরে এনে ওদের খাইয়েছি!'
তাতে শিয়ালনী বলল, 'তা বললে কি হবে? যেমন করে পারো একটা ধরে আনো, নইলে খোকারা থামছে না।' বলে সে ছানাগুলোকে আরও বেশি করে চিমটি কাটতে লাগল।
তখন শিয়াল বলল, 'আচ্ছা, রোসো রোসো। ওই যে একটা বাঘ আসছে। আমার ঝপাংটা দাও, এখুনি ওকে ভতাং করছি।'
ঝপাং বলেও কিছু নেই, ভতাং বলেও কিছু নেই- সব শিয়ালের ফাঁকি। বাঘের কিন্তু সেই ঝপাং আর ভতাং শুনেই প্রাণ উড়ে গেল, সে ভাবল, 'মাগো, এই বেলা পালাই। নইলে না জানি কী দিয়ে কী করবে এসে!' বলে সে আর সেখানে একটুও দাঁড়াল না। শিয়াল চেয়ে দেখল যে, সে লাফিয়ে লাফিয়ে ঝোপ-জঙ্গল ডিঙিয়ে ছুটে পালাচ্ছে! তখন শিয়াল আর শিয়ালনী লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, 'যাক, আপদ কেটে গেছে।'
বাঘ তখনও এমনি ছুটেছে যে তেমন আর সে কখনও ছোটেনি।
একটা বানর গাছের উপর থেকে তাকে ছুটতে দেখে ভারি আশ্চর্য হয়ে ভাবল, তাই তো, বাঘ এমনি করে ছুটছে, এ তো সহজ কথা নয়! নিশ্চয় একটা ভয়ানক কিছু হয়েছে! এই ভেবে সে বাঘকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, 'বাঘ ভাই, বাঘ ভাই, কী হয়েছে? তুমি যে অমন করে ছুটে পালাচ্ছো?'
বাঘ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, 'সাধে কি পালাচ্ছি? নইলে এক্ষুণি আমাকে ধরে খেতো!'
বানর বলল, 'তোমাকে ধরে খায় এমন কোনো জানোয়ারের কথা তো আমি জানি না। ও কথা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না!'
বাঘ বলল, 'সেখানে থাকতে বাপু, তবে দেখতাম! দূর থেকে অমনি করে সকলেই বলতে পারে!'
বানর বলল, 'আমি যদি সেখানে থাকতাম, তবে তোমাকে বুঝিয়ে দিতাম যে সেখানে কিছু নেই। তুমি বোকা, তাই মিছামিছি অত ভয় পেয়েছ।'
এ কথায় বাঘের ভারি রাগ হলো। সে বলল, 'বটে! আমি বোকা? আর তোমার বুঝি ঢের বুদ্ধি! চলো তো একবার সেখানে যাই।'
বানর বলল, 'যাব বইকি, যদি আমাকে পিঠে করে নিয়ে যাও।'
বাঘ বলল, 'তাই সই! আমার পিঠে বসেই চলো!' এই বলে সে বানরকে পিঠে করে আবার গর্তের দিকে ফিরে চলল।
শিয়াল আর শিয়ালনী সবে ছানাদের শান্ত করে একটু বসেছে। আর অমনি বানরকে পিঠে করে বাঘ আবার আসছে। তখন শিয়ালনী তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে আবার ছানাগুলোকে চিমটি কাটতে লাগল, ছানাগুলোও ভূতের মতো চ্যাঁচাতে শুরু করল।
তখন শিয়াল আবার সেই রকম সুর করে বলল, 'আরে থামো, থামো! অত চেঁচিও না-অসুখ করবে।'
শিয়ালনী বলল, 'আমি বলছি, যতক্ষণ না একটা বাঘ এনে এদের খেতে দেবে, ততক্ষণ এরা কিছুতেই থামবে না।'
শিয়াল বলল, 'আমি যে ওদের মামাকে বাঘ আনতে পাঠিয়েছি। এখুনি সে বাঘ নিয়ে আসবে। তোমরা থামো!'
তারপর একটু চুপ করেই সে আবার বলল, 'ওই, ওই! ওই যে তোদের বাঁদর মামা একটা বাঘ ধরে এনেছে! আর কাঁদিস না। শিগগির ঝপাংটা দে, ভতাং করি!'
বানরের এতক্ষণ খুব সাহস ছিল। কিন্তু ঝপাং আর ভতাঙের কথা শুনে আর সে বসে থাকতে পারল না। সে এক লাফে একটা গাছে উঠে, দেখতে দেখতে কোথায় পালিয়ে গেল।
আর বাঘের কথা কী আর বলব! সে যে সেইখান থেকে ছুট দিল, দুদিনের মধ্যে আর দাঁড়ালই না।
তারপর থেকে আর শিয়ালদের কোনো কষ্ট হয়নি। তারা মনের সুখে সেই গর্তে থেকে দিন কাটাতে লাগল।
বাঘখেকো শিয়ালের ছানা গল্পের মূলভাব
বুদ্ধি ও উপস্থিত বুদ্ধি অনেক সময় শক্তির চেয়েও বেশি কার্যকর হয়। শিয়াল ও শিয়ালনী তাদের বুদ্ধি ও কৌশল দিয়ে ভয়ঙ্কর বাঘকে দুবার ফাঁকি দেয় এবং নিজেদের ও তাদের ছানাদের নিরাপদ রাখে। এই গল্প থেকে শেখা যায় যে বিপদের সময় ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করলে বড় সমস্যাও মোকাবিলা করা সম্ভব।
বাঘখেকো শিয়ালের ছানা গল্পের প্রশ্ন ও উত্তর
সহজ ও অসাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শিয়াল ও শিয়ালনীর কয়টি ছানা ছিল?
উত্তর: শিয়াল ও শিয়ালনীর তিনটি ছানা ছিল।
২. তারা কেন একটি গর্ত খুঁজছিল?
উত্তর: ছানাদের নিরাপদে রাখার জন্য তারা একটি গর্ত খুঁজছিল।
৩. যে গর্তটি তারা পেল, সেটি কার ছিল?
উত্তর: গর্তটি একটি বাঘের ছিল।
৪. বাঘের গর্তে থাকার বিষয়ে শিয়ালনী কেন ভয় পেয়েছিল?
উত্তর: কারণ বাঘ ফিরে এলে তাদের প্রাণের ভয় ছিল।
৫. বাঘ এলে শিয়াল কী কৌশল অবলম্বন করতে বলেছিল?
উত্তর: শিয়াল বলেছিল, শিয়ালনী ছানাদের চিমটি কাটবে যাতে তারা কাঁদে, আর সে এমনভাবে কথা বলবে যেন ছানারা বাঘ খেতে চায়।
৬. বাঘ কেন ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল?
উত্তর: সে ভেবেছিল গর্তের ভিতরে ভয়ংকর কোনো প্রাণী আছে, যার বাচ্চারা বাঘ খেতে চায়।
৭. বাঘকে কে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল কী হয়েছে?
উত্তর: একটি বানর।
৮. বানর কেন বাঘের সঙ্গে গর্তের দিকে গিয়েছিল?
উত্তর: সে মনে করেছিল বাঘ অযথা ভয় পেয়েছে এবং সত্যতা যাচাই করতে চেয়েছিল।
৯. দ্বিতীয়বার বাঘ কেন আবার পালিয়ে গেল?
উত্তর: শিয়ালের কথা শুনে সে ভাবল বানর সত্যিই তার জন্য একটি বাঘ ধরে এনেছে এবং তাকে খেয়ে ফেলবে।
১০. গল্পের শিক্ষা কী?
উত্তর: বুদ্ধি ও কৌশল অনেক সময় শক্তির চেয়েও বড় শক্তি।
বাঘখেকো শিয়ালের ছানা (English Version)
The Fox Cubs Who Wanted to Eat Tigers
Once there lived a fox and a vixen. They had three little cubs, but they had no home.
One day they found a cave to live in. However, there were tiger footprints all around it. The vixen became frightened and said, “This must be a tiger’s den. What if the tiger comes back?”
The fox replied, “We have searched everywhere and found no other place. We must stay here.”
Then the fox made a clever plan. He told the vixen, “If the tiger comes, pinch the cubs so they cry loudly. When I ask why they are crying, tell me they want to eat tiger meat.”
A few days later, the tiger returned. The vixen pinched the cubs, and they began to cry loudly.
The fox asked in a deep voice, “Why are the children crying?”
The vixen replied, “They want to eat tiger meat.”
Hearing this, the tiger stopped in fear. Then the fox said, “We have already fed them all the tigers we could find. Now there are none left.”
The tiger became terrified. When the fox shouted, “Quick! Give me the Zhapang so I can Vatang this tiger!”, the tiger ran away at once.
On the way, a monkey saw the tiger running and asked what had happened. The tiger explained everything.
The monkey did not believe him and said, “You are being foolish. Let us go back and see.”
The tiger carried the monkey on his back and returned to the den.
When the fox saw them coming, he repeated the same trick. This time he shouted, “Look! The monkey uncle has brought a tiger for the cubs!”
The monkey became frightened and jumped into a tree. The tiger, even more terrified than before, ran away and did not return for a long time.
From then on, the fox family lived happily in the tiger’s den.
Moral: Intelligence and quick thinking can overcome even the greatest strength.
আরো গল্প পড়ুন,
১. রাখাল ও বাঘের গল্প - চালাক রাখালের বুদ্ধি ও গ্ৰামবাসী।
২. চালাক শিয়াল ও বোকা ছাগলের গল্প
৩. বানর আর বাঘের গল্প - বাঘ খেলো বানর কে

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url