দাদুর লাঠি ভেঙ্গে গেল – ছোট্ট নাবিল দাদু কে সাহায্য করল

ছোট্ট ছেলে নাবিল, যে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ালেখা করে। তার দাদু আব্দুল করিম সাহেব নাবিল কে স্কুলে আসে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তিনি কাঠের লাঠি হাতে নিয়ে নাবিলের স্কুলে আসে এবং তাঁকে বাড়ি নিয়ে যায়। 
ছোট নাবিল ও তার দাদু

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে নাবিলের দাদুর লাঠি ভেঙ্গে যায় এবং নাবিল দাদু কে বাড়ি নিয়ে যায়। কীভাবে নাবিল তার দাদু কে সাহায্য করল চলুন গল্পটি পড়ি। এটি দাদুর মেহগনি কাঠের লাঠি (Wooden stick) নিয়ে একটি শিশুতোষ গল্প। এটি ছোটদের বড়দের সাহায্য কীভাবে করতে হয় তা শেখাবে। 

দাদুর লাঠি আর ছোট্ট নাবিল - 

দুপুরে স্কুল ছুটি হয়েছে। আকাশে রোদের তেজ কিছুটা কমে এসেছে, আর গ্রামের কাঁচা রাস্তার দুপাশে বাতাসে দুলছে ধানের গাছ। স্কুলের গেট দিয়ে একে একে ছাত্রছাত্রীরা বেরিয়ে আসছে। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরছে, কেউ আবার রাস্তার পাশের দোকান থেকে ঝালমুড়ি কিনছে।

স্কুলের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন নাবিলের দাদু আবদুল করিম। তাঁর পরনে সাদা পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা আর পায়ে পুরোনো একজোড়া স্যান্ডেল। মাথার চুল প্রায় সাদা হয়ে এসেছে। হাঁটার সময় তিনি ডান হাতে একটি মেহগনি কাঠের লাঠি ধরে হাঁটেন। 

লাঠিটি তাঁর বহুদিনের সঙ্গী। কাঠের গায়ে সময়ের ছাপ পড়েছে, হাতলটির রং কিছুটা মলিন হয়ে গেছে, আর নিচের দিকটা বারবার মাটিতে ঠেকতে ঠেকতে মসৃণ হয়ে উঠেছে।

কিছুক্ষণ পর স্কুলের গেট দিয়ে ছোট্ট নাবিল বেরিয়ে এল। তার কাঁধে নীল রঙের স্কুলব্যাগ, পরনে স্কুলের পোশাক, আর মুখে সারাদিনের পড়াশোনা শেষে বাড়ি ফেরার আনন্দ। 

দাদুকে দেখে সে দৌড়ে কাছে এসে বলল: দাদু, তুমি অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছ? আমার আজকে ছুটি হতে একটু দেরি হয়েছে।

দাদু মৃদু হেসে বললেন: না রে দাদুভাই, খুব বেশি সময় হয়নি। তবে তুই বের হতে দেরি করায় ভাবছিলাম, আজ আবার ক্লাসে কোনো নতুন গল্প শুনে বসে থাকিসনি তো!

নাবিল হেসে উঠল। আরে না দাদু। আজ আমাদের স্যার গাছ নিয়ে পড়িয়েছেন। জানো, একটা বড় গাছ কত বছর বেঁচে থাকতে পারে?

সব গাছের বয়স এক রকম হয় না রে। কোনো গাছ অল্প কয়েক বছর বাঁচে, আবার কোনো গাছ মানুষের কয়েক প্রজন্ম পার হয়ে ও বেঁচে থাকে। তুই মন দিয়ে পড়াশোনা করলে এসব বিষয় আরও ভালোভাবে জানতে পারবি।

এরপর, নাবিল দাদুর হাত ধরল। তারপর দুজনে ধীরে ধীরে বাড়ির পথ ধরল।

গ্রামের এই পথটি নাবিলের খুব চেনা। স্কুল থেকে বেরিয়ে প্রথমে তাদের যেতে হয় ছোট্ট একটি বাজারের পাশ দিয়ে। সেখানে মুদি দোকান, চায়ের দোকান, একটি সেলুন আর সবজির দোকান রয়েছে। 

বাজার পেরিয়ে বাঁ দিকে গেলে পড়ে একটি পুকুর। পুকুরের পাশে কয়েকটি নারকেলগাছ, আর তার পরেই শুরু হয়েছে মাটির রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলেই তাদের বাড়ি।

প্রতিদিনের মতো সেদিনও দাদু নাবিলকে স্কুল থেকে নিয়ে ফিরছিলেন। নাবিল সারাদিনের পড়াশোনার গল্প বলছিল, আর দাদু মাঝেমধ্যে প্রশ্ন করে তার কথা শুনছিলেন। দাদুর হাতে থাকা মেহগনি কাঠের লাঠিটি মাটিতে প্রতিবার পড়তেই ঠুকঠুক শব্দ হচ্ছিল।
স্কুল থেকে ফেরার পথে দাদু ও ছোট্ট নাবিল গল্প করছে

নাবিল হঠাৎ দাদুর লাঠিটির দিকে তাকিয়ে বলল: দাদু, তোমার এই লাঠিটা তো অনেক পুরোনো! তুমি কি এটা অনেক বছর ধরে ব্যবহার করছ?

দাদু লাঠির হাতলটা একটু শক্ত করে ধরে বললেন: হ্যাঁ রে, অনেক বছর ধরেই তো আমার সঙ্গে আছে। এই লাঠি নিয়ে কত পথ হেঁটেছি, কত বাজারে গিয়েছি, কত মানুষের বাড়িতে গিয়েছি, তার হিসাব নেই।

তুমি এটা কোথা থেকে কিনেছিলে, দাদু?

অনেক বছর আগে পাশের গ্ৰামের বড় বাজারের এক কাঠের জিনিসপত্রের দোকান থেকে কিনেছিলাম। তখন তোর বাবা ছোট ছিল। আমার হাঁটতে একটু কষ্ট হতো বলে এমন একটা শক্ত লাঠি খুঁজছিলাম, যেটা অনেক দিন টিকবে। 

দোকানদার আমাকে মেহগনি কাঠের একটা লাঠি দেখিয়েছিলেন। কাঠটা শক্ত, রংটা সুন্দর লালচে-বাদামি, আর হাতলটাও বেশ আরামদায়ক ছিল। তাই এটি কিনে নিয়েছিলাম।

নাবিল অবাক হয়ে বলল: তাহলে লাঠিটা আমার বাবার ছোটবেলা থেকেই তোমার কাছে আছে?

হ্যাঁ। তোর বাবা তখন তোর মতো ছোট ছিল। এখন তুই বড় হচ্ছিস, তোর বাবারও বয়স হয়েছে, আর আমার চুলগুলো সব সাদা হয়ে গেছে। কিন্তু এই লাঠিটা এত দিন আমার সঙ্গেই আছে।

নাবিল লাঠির দিকে তাকিয়ে বলল: দাদু, লাঠিটা দেখতে পুরোনো হলেও আমার কাছে খুব সুন্দর লাগে। এর গায়ে ছোট ছোট দাগ আছে, হাতলের রংও একটু উঠে গেছে। তবু এটা তোমার খুব প্রিয়, তাই না?

দাদু স্নেহভরা চোখে নাতির দিকে তাকালেন: অবশ্যই! পুরোনো হলেই কোনো জিনিসের মূল্য কমে যায় না। অনেক সময় পুরোনো জিনিসের সঙ্গে এমন স্মৃতি জড়িয়ে থাকে, যা নতুন কোনো জিনিসে পাওয়া যায় না।

নাবিল কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর দাদুর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

কিছুক্ষণ হাঁটার পর তারা বাজারের শেষ মাথায় পৌঁছে গেল। সেখান থেকে বাড়ির রাস্তা একটু সরু হয়ে এসেছে। রাস্তার এক পাশে পুরোনো একটি বাঁশঝাড়, অন্য পাশে নিচু জমি। আগের রাতে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তার কিছু জায়গায় মাটি নরম হয়ে ছিল। কোথাও কোথাও ছোট ছোট গর্তে পানি জমে আছে।

দাদু খুব সাবধানে পা ফেলছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছে, তাই হাঁটার সময় শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে লাঠিটির ওপর বেশ ভর দিতে হয়। নাবিলও দাদুর পাশে পাশে হাঁটছিল। স্কুলে আজ কী কী পড়ানো হয়েছে, তা নিয়ে তাদের কথা তখনো শেষ হয়নি।

নাবিল বলল: দাদু, আজ আমাদের স্যার বলেছেন, পরিবারের সবাইকে একে অপরের যত্ন নিতে হয়। মা-বাবা আমাদের যত্ন নেন, বড়রা আমাদের বিপদ থেকে বাঁচান। 

কিন্তু আমি একটা কথা ভাবছিলাম।

কী কথা ভাবছিলি, দাদুভাই? আমরা ছোটরা কি বড়দেরও সাহায্য করতে পারি?

দাদু মৃদু হেসে বললেন: অবশ্যই পারিস। সাহায্য করার জন্য বয়স বড় হওয়া লাগে না। যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, সে ততটুকু দিয়েই অন্যের উপকার করতে পারে। কখনো একটা হাত বাড়িয়ে দেওয়া, কখনো কারও কথা মন দিয়ে শোনা, আবার কখনো বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোও অনেক বড় সাহায্য।

নাবিল কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় দাদু রাস্তার একটি খানাখন্দ এড়িয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালেন।

দাদুর মেহগনি কাঠের লাঠিটি মাটিতে পড়তেই অস্বাভাবিক একটা শব্দ হলো। তারপরই শোনা গেল মট করে ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ।

আরে! আমার লাঠিটা!

দাদুর মুখ থেকে কথাটি বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে গেল। দাদু পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল। 
কাঠের লাঠিটা ভাংছে, দাদু পড়ে আছে এবং নাবিল দাদুর হাত ধরে আছে


নাবিল প্রথমে বুঝতেই পারেনি কী হয়েছে। কিন্তু দাদুকে পড়ে যেতে দেখে সে দ্রুত তাঁর বাঁ হাত ধরে ফেলল। তারপর নিজের ছোট্ট শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দাদুর হাত ও কাঁধ আঁকড়ে ধরল।

দাদু! সাবধানে! তুমি পড়ে যাচ্ছ!

দাদু কোনো রকমে নাবিলের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালেন। তাঁর শরীর কাঁপছিল। কয়েক মুহূর্ত তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

নাবিল ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল: দাদু, তোমার কোথাও লেগেছে? ব্যথা পেয়েছ? তুমি ঠিক আছ তো?

দাদু ধীরে ধীরে শ্বাস নিয়ে বললেন: না রে, তেমন কিছু হয়নি। তুই সময়মতো ধরে না ফেললে আজ হয়তো মাটিতে পড়েই যেতাম। কোমরে বা হাতে আঘাতও লাগতে পারত।

নাবিল এবার নিচের দিকে তাকাল। মাটিতে পড়ে আছে দাদুর বহু বছরের পুরোনো মেহগনি কাঠের লাঠি। লাঠিটির মাঝামাঝি একটি অংশে ফাটল ধরে কাঠ ভেঙে গেছে। ভাঙা জায়গাটিতে কাঠের আঁশ বেরিয়ে আছে। লাঠির নিচের অংশটি একদিকে পড়ে আছে, আর হাতলসহ ওপরের অংশটি রাস্তার পাশে কাত হয়ে পড়ে আছে।

নাবিল লাঠির টুকরো দুটি তুলে হাতে নিল। তার মুখটা মলিন হয়ে গেল।‌ দাদু, তোমার লাঠিটা ভেঙে গেল! এখন তুমি হাঁটবে কীভাবে?

দাদু ভাঙা লাঠিটির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন: কী আর করব রে নাবিল! অনেক দিনের পুরোনো লাঠি। প্রতিদিন মাটিতে ভর দিতে দিতে কাঠটা হয়তো ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। বাইরে থেকে বুঝতে পারিনি। আজ একটু বেশি চাপ পড়তেই ভেঙে গেল।

নাবিল ভাঙা কাঠের অংশটি ভালো করে দেখল। লাঠির গায়ে ছোট ছোট আঁচড়, হাতলের কাছে পুরোনো দাগ এবং কাঠের রং উঠে যাওয়া জায়গাগুলো তার চোখে পড়ল।

সে বলল: দাদু, এটা কি আর ঠিক করা যাবে না?

নারে দাদু ভাই।

নাবিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ভাঙা লাঠির দুটি অংশ নিজের স্কুলব্যাগের পাশে ধরে দাদুর দিকে তাকাল।

দাদু, তুমি মন খারাপ কোরো না। আমরা বাড়িতে গিয়ে আব্বুকে বলব। আব্বু নিশ্চয়ই তোমার জন্য একটা ভালো লাঠির ব্যবস্থা করবেন।

দাদু নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

ঠিক আছে। কিন্তু তুই যেভাবে আমাকে ধরে ফেললি, তাতে আজ সত্যিই বড় বিপদ থেকে বেঁচে গেলাম।

দাদু চলো তোমাকে বাড়ি নিয়ে যায়। 

দাদু বলল: তুই কি আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবি ভাই। 

নাবিল বলল: আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারব। তুমি আমার ঘাড়ে হাত দাও। তোমাকে আমি বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। 

দাদু এবার নাবিলের কাঁধে হাত রাখলেন এবং নাবিল কে তার দাদু ধন্যবাদ জানালো।‌
ছোট্ট নাবিলের ঘাড় ধরে হাঁটছে তার দাদু

নাবিল নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে দাদুর কোমরের পাশটা ধরে রাখল। তারপর বলল: দাদু, তুমি আমাকে প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে আসো, আবার ছুটির পর বাড়িতে নিয়ে যাও। রোদ থাকুক, বৃষ্টি থাকুক, তুমি আমার জন্য স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি ছোট বলে তুমি সব সময় আমার খেয়াল রাখো। আজ তোমার একটু বিপদ হয়েছে, আর আমি তোমাকে সাহায্য করব না। 

এতে আবার ধন্যবাদ দেওয়ার কী আছে?

দাদু স্নেহভরা চোখে বললেন: তবু তোকে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করছে রে। তুই ছোট মানুষ, অথচ আমাকে যেভাবে সামলে নিলি, যা আমার আমার সৌভাগ্য।

নাবিল এবার একটু অভিমানী গলায় বলল, দাদু, একটা কথা বলব?

বল দাদুভাই।

বড়রা শুধু ছোটদের খেয়াল রাখবে, আর ছোটরা বড়দের খেয়াল রাখবে না, তা কি কখনো হয়? বড়রা বিপদে পড়লে ছোটরা কি তাদের সাহায্য করবে না? তুমি আমার দাদু, তুমি আমার আপনজন। তোমার বিপদের সময় তোমাকে সাহায্য করা আমার দায়িত্ব। তুমি যেমন আমার হাত ধরে রাস্তা পার করাও, আমিও তো তোমার হাত ধরে তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারি!

তোমার লাঠি ভেঙ্গেছে তো কী হয়েছে। আজ আমি তোমার লাঠি। চলো দাদু, বাড়ি চলো।‌

কথাগুলো শুনে দাদু কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। তাঁর চোখেমুখে আনন্দের ছাপ ফুটে উঠল। ছোট্ট নাতির মুখ থেকে এমন সুন্দর কথা শুনবেন, তা হয়তো তিনি কখনোই ভাবেননি।

এরপর, তিনি নাবিলের কাঁধে হাত রেখে বললেন: তুই ঠিকই বলেছিস, দাদুভাই। পরিবারের মানুষ একে অপরের যত্ন নেয় বলেই পরিবার এত সুন্দর। শুধু বড়রা ছোটদের আগলে রাখবে, এমন নয়। ছোটরাও বড়দের ভালোবাসবে, তাঁদের খেয়াল রাখবে। আজ তুই আমাকে সেই কথাটাই মনে করিয়ে দিলি এবং বাস্তবে দেখিয়ে দিলি কীভাবে বড়দের বিপদে ছোটরা সাহায্য করতে পারে। 

নাবিল হাসল।

তাহলে এখন থেকে শুধু তুমি শুধু আমার খেয়াল রাখবে না, আমিও তোমার খেয়াল রাখব!

আচ্ছা, ঠিক আছে। তবে একটা কথা মনে রাখিস, কাউকে সাহায্য করতে গেলে নিজের নিরাপত্তার কথাও ভাববি। প্রয়োজনে অন্য বড়দের ডাকবি।

ঠিক আছে, দাদু। আমি তোমার কথা মনে রাখলাম।

দাদু নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর দুজনে আবার ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।

এত দিন দাদুর হাতে থাকা মেহগনি কাঠের লাঠিটি তাঁর হাঁটার সময় শরীরের ভার বহন করতে সাহায্য করত। কিন্তু লাঠি ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিটি ধাপ নাবিলের দাদুর জন্য কঠিন হয়ে উঠল। কখনো তিনি নাবিলের কাঁধে হাত রাখছেন, কখনো রাস্তার পাশে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন।

বাঁশঝাড়ের পাশের রাস্তা পেরোনোর সময় নাবিল বলল: দাদু, তুমি একটু দাঁড়াও। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। আস্তে আস্তে হাঁটি।

দাদু বললেন: হ্যাঁ রে। তুই পাশে আছিস বলে সাহস পাচ্ছি। তবে বাড়ি পর্যন্ত এখনো কিছুটা পথ বাকি।

আমি তোমার হাত ধরে থাকব। তুমি শুধু সাবধানে পা ফেলো।

তারা ধীরে ধীরে পুকুরের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল। পুকুরের পানিতে দুপুরের আলো পড়েছে। কয়েকটি হাঁস পানিতে সাঁতার কাটছে, আর পুকুরের ঘাটে একজন লোক গোসল করছিল। 

তাঁদের দেখে লোকটি জিজ্ঞেস করলেন: করিম ভাই, কী হয়েছে? আপনাকে আজ এত কষ্ট করে হাঁটতে হচ্ছে কেন? আপনার লাঠি কোথায়? 

করিম সাহেব বললেন: আর বলবেন না ভাই। আমার পুরোনো লাঠিটা নাতি কে নিয়ে স্কুল থেকে আসার পথে ভেঙে গেছে। এই যে নাতি, ও সময়মতো ধরে না ফেললে পড়েই যেতাম।

লোকটি নাবিলের দিকে তাকিয়ে বললেন: বাহ, নাবিল তো বেশ ভালো কাজ করেছে! দাদুকে সাবধানে বাড়ি নিয়ে যাও বাবা।

নাবিল মাথা নেড়ে বলল: জি, চাচা। আমি দাদুর সঙ্গে আছি।

লোকটি আবার বললেন: করিম ভাই, চাইলে আমার ছেলেকে পাঠিয়ে দিতে পারি। সে আপনাদের বাড়ি পর্যন্ত সাহায্য করে দেবে।

দাদু কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বললেন, ধন্যবাদ ভাই। 

এরপর আবার দুজনে হাঁটা শুরু করল।‌

আরও কিছুটা পথ পেরিয়ে তারা নিজেদের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাল। বাড়ির সামনের উঠানে তখন নাবিলের মা রেহানা কাপড় শুকানোর দড়ি থেকে কয়েকটি শুকনো কাপড় নামাচ্ছিলেন। রান্নাঘর থেকে ভাতের গন্ধ আসছিল। উঠানের এক কোণে রাখা কলাগাছের পাতায় বাতাস লাগছিল, আর মুরগিগুলো খাবারের সন্ধানে মাটি ঠুকরে বেড়াচ্ছিল।

দূর থেকে নাবিল ও তার দাদুকে আসতে দেখে রেহানা প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই তাকালেন। কিন্তু কাছে আসতেই তাঁর চোখে পড়ল, নাবিলের‌ দাদু নাবিলের কাঁধে হাত রেখে খুব কষ্ট করে হাঁটছেন। তাঁর হাতে কোনো লাঠি নেই।

রেহানা দ্রুত কাপড়গুলো এক পাশে রেখে এগিয়ে এলেন।

আব্বা, কী হয়েছে আপনার? আপনি এভাবে হাঁটছেন কেন? আর আপনার লাঠিটা কোথায়?

তিনি দাদুর অন্য হাতটি ধরে উঠানের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন।

করিম সাহেব বললেন: আরে মা, ভয়ের কিছু নেই। একটু বিপদ হয়েছিল, তবে নাবিল আমাকে ধরে ফেলেছে।

রেহানা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,

বিপদ হয়েছিল মানে? কী হয়েছে, একটু খুলে বলুন তো!

নাবিল তাড়াতাড়ি বলল: আম্মু, দাদুর লাঠিটা রাস্তায় হঠাৎ ভেঙে গেছে! দাদু পড়ে যাচ্ছিলেন। আমি দাদুর হাত ধরে ফেলেছি, তাই উনি পড়ে যাননি। তারপর আমি দাদুর হাত ধরে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে এসেছি।

রেহানা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর করিম সাহেব কে উঠানের পাশে রাখা কাঠের চেয়ারটিতে বসতে সাহায্য করলেন এবং বললেন আল্লাহর রহমতে বড় কোনো বিপদ হয়নি। 

আব্বা, আপনার কোথাও ব্যথা পেয়েছেন কি না বলুন তো? হাত-পা ঠিক আছে তো?

করিম সাহেব ধীরে ধীরে হাত-পা নাড়িয়ে দেখলেন।

না মা, কোথাও তেমন ব্যথা পাইনি। শুধু হঠাৎ লাঠিটা ভেঙে যাওয়ায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলাম। নাবিল না ধরলে হয়তো পড়ে যেতাম।

রেহানা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

তাহলে আজ নাবিল সত্যিই আপনাকে বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে।

নাবিল একটু লজ্জা পেয়ে বলল, আম্মু, আমি তো শুধু দাদুকে ধরে ফেলেছি। দাদু প্রতিদিন আমাকে স্কুলে নিয়ে যান। আজ আমি দাদুকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছি, এই আর কী!

রেহানা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

তাঁরা দুজন কে বারান্দায় বসতে দিলেন রেহানা।‌ তাঁরা দুইজন আবার গল্প আর মজা করতে লাগলেন। 
দাদু ও ছোট্ট নাবিল একসাথে বসে আছে

নাবিল তার ঘরে চলে গেল এবং স্কুল ড্রেস চেঞ্জ করল এবং দুপুরে গোসল করে নিল। 

দুপুরে সবাই মিলে ভাত খাওয়া দাওয়া করল। 

সেদিন সন্ধ্যায় নাবিলের আব্বু বাড়ি ফিরে পুরো ঘটনা শুনলেন। রেহানা তাঁকে জানালেন, কীভাবে দাদুর মেহগনি কাঠের পুরোনো লাঠিটি ভেঙে গেছে এবং নাবিল কীভাবে তাঁকে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

নাবিলের আব্বু ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন: বাবা, তুমি তোমার দাদুকে ধরে ফেলেছিলে? দাদু পড়ে গেলে তো অনেক বড় আঘাত পেতে পারতেন!

নাবিল বলল: হ্যাঁ, আব্বু। দাদুর লাঠিটা হঠাৎ ভেঙে যায়। আমি দাদুর হাত ধরে ফেলেছিলাম। তারপর দাদুর হাত ধরে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে এসেছি।

আব্বু ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন: তুমি খুব ভালো কাজ করেছ। 

তারপর তিনি দাদুর কাছে গিয়ে বসলেন।

আব্বা, আপনার জন্য নতুন একটা ভালো লাঠি কিনে আনতে হবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আমি বাজারে গিয়ে দেখে আসব। এমন লাঠি কিনব, যেটা আপনার উচ্চতা ও হাঁটার প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই হবে।

করিম সাহেব বললেন, বাবা, লাঠি কেনার সময় শুধু কাঠের রং বা সৌন্দর্য দেখিস না। হাতলটা একটু বড় দেখে কিনিস, তিন ফিটের একটা লাঠি কিনিস। 

নাবিলের আব্বা মাথা নেড়ে বললেন, ঠিক আছে, আব্বা। দোকানদারকে আপনার প্রয়োজনের কথা বুঝিয়ে বলব। সম্ভব হলে আপনাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব, যাতে আপনি নিজেই লাঠিটা হাতে ধরে দেখতে পারেন এবং পছন্দ অনুযায়ী কিনতে পারেন। 

নাবিল আনন্দিত হয়ে বলল; আব্বু, আমিও তোমার সঙ্গে যাব! 

আব্বু হেসে বললেন: অবশ্যই যাবে। 

দাদু নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। সেদিন রাতের খাবার খাওয়ার পর নাবিল তার পড়ার টেবিলে বসে পড়া শেষ করল। ঘুমাতে যাওয়ার আগে সে আবার দাদুর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল, দাদু বিছানায় শুয়ে আছেন। ভাঙা লাঠিটির দুটি অংশ ঘরের এক পাশে যত্ন করে রাখা হয়েছে।

নাবিল বলল: দাদু, তোমার পা বা কোমরে এখনো ব্যথা করছে?

দাদু বললেন: না রে, এখন ভালো আছি। তুই বরং ঘুমিয়ে পড়। সকালে স্কুল আছে।

নাবিল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল: আচ্ছা, দাদু। 

পরবর্তী কয়েক দিন দাদু বাড়ির ভেতরেই বেশি সময় কাটালেন। বাইরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে নাবিলের আব্বু বা বাড়ির অন্য কেউ তাঁর সঙ্গে থাকতেন। নাবিলও স্কুল থেকে ফিরে দাদুর পাশে বসত, গল্প করত এবং পুরোনো দিনের কথা শুনত।

এই সময়ে নাবিলের আব্বু বাজারের কয়েকটি দোকানে লাঠি দেখলেন। তিনি এমন একটি লাঠি খুঁজছিলেন, যেটা দেখতে সুন্দর হওয়ার পাশাপাশি তার বাবার জন্য নিরাপদ ও ব্যবহার উপযোগী হবে।

একদিন বিকেলে তিনি নাবিলকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের বড় বাজারে গেলেন। বাজারের এক পাশে কাঠের আসবাব ও বিভিন্ন ধরনের কাঠের জিনিস বিক্রির দোকান ছিল। দোকানের সামনে কয়েকটি কাঠের চেয়ার রাখা এবং দেয়ালে ঝোলানো ছিল হাতলযুক্ত লাঠি।

দোকানদার তাঁদের দেখে এগিয়ে এলেন। কী লাগবে, ভাই?

নাবিলের আব্বু বললেন, আমার বাবার জন্য একটা ভালো হাঁটার লাঠি চাই। তিনি অনেক বছর ধরে মেহগনি কাঠের লাঠি ব্যবহার করেছেন। কয়েক দিন আগে পুরোনো লাঠিটি ভেঙে গেছে। এখন এমন একটা লাঠি দরকার, যেটা তাঁর উচ্চতার সঙ্গে মানানসই হবে এবং হাঁটার সময় ভালোভাবে ভর হাঁটতে পারবে।

দোকানদার কয়েকটি লাঠি বের করে দেখালেন। একটি ছিল গাঢ় বাদামি রঙের, আরেকটি ছিল হালকা রঙের কাঠের তৈরি। একটি লাঠির হাতল বাঁকানো, অন্যটির হাতল সোজা। কয়েকটির লাঠির নিচে রাবারের মাথা লাগানো ছিল, যাতে মাটিতে ঠেকানোর সময় পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।

নাবিল একটির পর একটি লাঠি দেখছিল। সে একটি লালচে-বাদামি রঙের লাঠি তুলে তার আব্বুকে বলল,

আব্বু, এই লাঠিটার রং দাদুর পুরোনো লাঠির মতো! এটা কি মেহগনি কাঠের?

দোকানদার লাঠিটি হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে বললেন: হ্যাঁ, এটা মেহগনি কাঠের তৈরি। 

এই লাঠিটা আপনার বাবার উচ্চতা অনুযায়ী ঠিক করা যাবে। হাতলটা ধরতেও আরামদায়ক। তবে কেনার আগে আপনার বাবাকে দিয়ে মাপ মিলিয়ে নেওয়া ভালো হবে।

নাবিল বলল, আব্বু, দাদুকে সঙ্গে নিয়ে এলে আরও ভালো হতো। তাহলে দাদু নিজেই দেখে নিতে পারতেন।

আব্বু মাথা নেড়ে বললেন: তুমি ঠিক বলেছ। তবে আজ আমরা কয়েকটি লাঠি দেখে রাখি। এরপর দাদুকে নিয়ে এসে তাঁর জন্য উপযুক্ত লাঠিটি কিনব।

তারা দোকানদারের কাছ থেকে লাঠিগুলোর দাম ও ব্যবহার সম্পর্কে জেনে বাড়ি ফিরে এল।

পরদিন নাবিলের আব্বু করিম সাহেব কে নিয়ে আবার বাজারে গেলেন। দাদু নিজের উচ্চতা ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী কয়েকটি লাঠি হাতে ধরে দেখলেন। 

এরপর দাদু লাঠিটি ধরে কয়েক পা হাঁটলেন। নাবিলের আব্বু পাশে থেকে দেখলেন, লাঠির ওপর ভর দিয়ে হাঁটার সময় আব্বা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন কি না।

সবকিছু দেখে দাদু বললেন: হ্যাঁ বাবা।এই লাঠিটা আমার জন্য বেশ ভালো হবে। হাতলটা ধরতে আরাম, আর নিচের অংশটাও মাটিতে ভালোভাবে ঠেকছে।

আব্বু নতুন লাঠিটির দাম পরিশোধ করে সেটি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।

নাবিল নতুন লাঠিটি দেখে আনন্দে বলল: দাদু, তোমার নতুন লাঠিটা দেখতে খুব সুন্দর! এবার তুমি আবার আমার সঙ্গে স্কুলের পথে হাঁটতে পারবে।

দেখতে সুন্দর তো বটেই, তবে সবচেয়ে ভালো লাগছে যে লাঠিটা ধরে আমার হাঁটতে সুবিধা হচ্ছে। তোর আব্বু আমার জন্য ভালো একটা লাঠি কিনেছে।

নাবিলের আব্বু বললেন: আব্বা, আপনি যখনই লাঠিটি ব্যবহার করবেন, মাঝে মাঝে এর হাতল, মাঝের অংশ এবং নিচের রাবারের মাথাটি পরীক্ষা করে নেবেন। কোনো ফাটল, ঢিলাভাব বা ক্ষয় দেখা দিলে আমাকে জানাবেন।

দাদু বললেন, অবশ্যই। পুরোনো লাঠিটা ভেঙে যাওয়ার পর বুঝেছি, হাঁটার সহায়ক কোনো জিনিসের যত্ন নেওয়া কতটা জরুরি।

দাদু, নতুন লাঠি তোমাকে হাঁটতে সাহায্য করবে, আর পুরোনো লাঠি তোমাকে পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দেবে।

দাদু হেসে বললেন: একদম ঠিক বলেছিস, দাদুভাই। 

আরো গল্প পড়ুন, 


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url