রবিন পরিবারের সঙ্গে গ্ৰামে বেড়াতে গেল এবং ছোট্ট কচ্ছপের সঙ্গে বন্ধুত্ব করল

শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুদিনের বিরতি নিতে রবিন পরিবারের সঙ্গে গ্রামে বেড়াতে গেল। গ্রামের সবুজ প্রকৃতি, পাখির ডাক এবং শান্ত পরিবেশ দেখে রবিন খুব আনন্দিত হলো।

পরিবারের সবাই আছে এবং রবিন কচ্ছপ দেখছে

আমরা শহরে বসবাস করি। যেখানে মানুষ, ভিড়, কোলাহল সহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সব সময় আছেই। তাই, শহুরে জীবন ছেঁড়ে কয়েকদিনের জন্য গ্ৰামে ঘুরতে যাওয়ার সখ ছিল বহুদিনের। কিন্তু সময় না থাকাই বাবা আমাদের গ্ৰামে নিয়ে যেতে পারে না। 

আমাদের পরিবারে মোট পাঁচজন সদস্য আছে। পরিবারে মা, বাবা, দুই বোন সহ আমি বসবাস করি। যদিও বাবা সৌদি আরবে কাজের উদ্দেশ্যে আছেন। তবে, কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশে আসবেন বাবা। 

আমরা মঙ্গলবার রাত ৯টায় বিমানবন্দরে পৌঁছে অপেক্ষা করছিলাম। 

অবশেষে আমাদের অপেক্ষার পালা শেষ হল।‌ বুধবার সকাল ১০টায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেই আমাদের সাথে আনন্দঘন মূহূর্ত অতিবাহিত করলেন বাবা। সেখানে আমি, আমার ছোট দুই বোন বিথি ও বর্ষা, এবং মা সবাই উপস্থিত ছিলাম। সবাই একসাথে বাসায় এসে পৌঁছলাম। 

এভাবে কেটে গেল বেশ কিছুদিন........

পরিবারের সাথে গ্ৰামে ঘুরতে যাওয়া 

১০ দিন পর আমি সহ আমার ছোটবোনেরা একসাথে বাবার কাছে বায়না ধরলাম গ্ৰামে ঘুরতে যাব। যদিও গ্ৰামে আমাদের তেমন কোন আত্মীয় স্বজন নেই। আমরা সাধারণত বাবার কাছে আবদার করলাম একদিনের জন্য গ্ৰামে ঘুরতে যাবো। ।

বাবা আমাদের ভাই-বোনদের কথা রাখলেন এবং শনিবার ঘুরতে যাওয়ার দিন ধার্য করল পরিবারের সবাই। কারণ, শুক্রবার ও শনিবার আমাদের সাপ্তাহিক স্কুল ছুটির দিন। 

শুক্রবার রাস্তায় এমনিতেই অনেক ভিড় হয়। তাই, শনিবার যাওয়াটাই আমাদের কাছে নিরাপদ এবং স্বস্তির মনে হল।‌
বাবা গাড়ি চালাচ্ছেন রবিন, বিথি, বৃষ্টি, মা গাড়ির সিটে বসে আছে

শনিবার সকাল ৮টা জিপ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম গ্ৰাম ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। গাড়িতে সকাল এবং দুপুরের খাবার নিয়েছিলাম। কারণ, গ্ৰামে ভাতের হোটেল না থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই, সকালের খাবার হিসেবে পরোটা ও ডাল নিয়েছিলাম এবং দুপুরের খাবার হিসেবে মাটন বিরিয়ানি রান্না করে নিয়ে গিয়েছিলাম। 

সবাই একসাথে খুবই আনন্দের সাথে গাড়িতে ড্রাইভিং উপভোগ করছিলাম। বিথি, বর্ষা এবং আমি গান গাইতে গাইতে গাড়ি চড়ে যাচ্ছিলাম। গাড়ির জানালা থেকে বাইরের দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল।

গ্ৰামের রাস্তা গুলো ছিল মাটির। কাচা রাস্তায় গাড়ি চলার সময় অনেক ধুলা উড়ছিল। 

রাস্তার আশেপাশে দেখতে পেলাম অনেক ছোট বড় গাছপালা। রাস্তার ধারে ছিল ছোট ছোট গাছপালার ঝোপ। 

ছোট ছোট গাছের উপর ডাল বিহীন বিভিন্ন লতানো উদ্ভিদ দেখা গেল। দেখতে পেলাম লতানো উদ্ভিদটির ফুল ফুটেছে সাদা সাদা। ফুলের পাশাপাশি লাতানো গাছটিতে লাল ও সবুজ রঙের ফলের দেখা মিলল।‌

আমার মনে প্রশ্ন জাগলো এবং আমি আমার মা কে জিজ্ঞেস করলাম এই গাছের নাম কি? মা বলল এই গাছের নাম হল ক্যালাকুচা গাছ। এটা ঝোপ, জঙ্গলে দেখা যায়। এই উদ্ভিদ শুধু গ্ৰামে নয় বরং শহরে ও দেখা যায়। 

আমি খুব অবাক হলাম। আমি এতো বছর ধরে শহরে বসবাস করছি। কিন্তু আমার চোখে একবার ও দেখতে পেলাম না। 

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বাবা গাড়ির ব্রেক চাপলেন এবং বললেন আমরা সবাই এখন এখানে বসে সকালের নাস্তা করব।

৮ টায় বাড়ি থেকে বের হয়ে ছিলাম এখন বাজে দশটা। দশটাই আমরা আমাদের সকালের নাস্তা খেয়ে নিলাম এবং কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলাম এবং আবার আমাদের গাড়ি গ্ৰামের ভিতরে প্রবেশ করতে লাগলো। 

এবারে আমাদের গন্তব্য হল একটি ছোট্ট নদী। যেখানে আমরা দুপুরের খাবার খাবো এবং নদীর ধারে ঘুরা ঘুরি করব এবং সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরে আসবো। 

গাড়ি চালাচ্ছিলো বাবা।

কয়েক ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর হঠাৎ আমি চিৎকার করে উঠল এবং বললাম বাবা দেখো দেখো একটা নদী দেখা যাচ্ছে। সেখানে গাছ পালা, এবং নদীর ওপারে পাহাড় ও রয়েছে। 

বাবা আমার কথা শুনে তাড়াতাড়ি করে গাড়ি থামালেন এবং নদীর দিকে তাকালেন। তিনি নদীর অসাধারণ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হলেন এবং আমরা সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম এখানে আমরা আজকে দুপুরের খাওয়া দাওয়া করব এবং ঘুরা ঘুরি করব। 

প্রথমে আমরা নদীর তীরে একটি ছায়াযুক্ত স্থানে একটি মাদুর পেতে তাতে আমরা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রাখলাম এবং দুপুরের খাবার (বিরিয়ানি) বের করলাম। 
দুপুরে বিরিয়ানি এবং অন্যান্য খাবার রয়েছে

বিরিয়ানির ঘ্রাণটা এতোটাই ছড়াচ্ছিল যে, আমরা সবাই বিরিয়ানির ঘ্রাণে প্লেট নিয়ে আমাকে দাও, আমাকে দাও বলা শুরু করলাম। মা আমাকে, বাবা কে ও আমার ভাইবোনদের দুপুরের খাওয়ার পরিবেশন করলেন। 

আমরা সবাই দুহাত চেটেপুটে বিরিয়ানি খেলাম। 

এদিকে বানর মশাই বিরিয়ানির ঘ্রাণ শুঁকে চলে এসেছে আমাদের পিকনিক স্পটে। তাঁকে ও আমরা কিছু পরিমাণ বিরিয়ানি দিলাম। 

খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমরা গ্ৰামের বিভিন্ন স্থান ঘুরে বেড়ালাম। বিশেষ করে সবজি খেত, বিভিন্ন বানিজ্যিক পেয়ারা বাগান, এবং নদীর তীরে ঘুরা ঘুরি করলাম। 

আমরা যখন যখন পেয়ারা বাগানের গিয়েছিল, তখন পেয়ারা গাছে সবুজ সবুজ অনেক পেয়ারা দেখেছিলাম। আমরা সেখানকার কেয়ার টেকার কে বলে কিছু পেয়ারা কিনে ছিলাম। আমরা সবাই পেয়ারা খাওয়া উপভোগ করলাম।

আমি সেখানে ২-৩ টা পেয়ারা খেয়েছিলাম। 

যদিও পেয়ারা খাওয়ার পর আমার পেট ব্যথা শুরু হয়েছিল। কারণ, আমি দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর পেয়ারা খেয়েছিলাম। 

আমরা পেয়ারা বাগান থেকে ঘুরে আসার পর আমরা বিকেল চারটার সময় বালুকাময় নদীর তীরে ফুটবল খেলেছিলাম। 

ফুটবল ⚽ খেলার সময় আমি সবচেয়ে ভালো ফুটবল খেললাম। যদিও বালুতে ফুটবল পাশ করা, সট করা বেশ কঠিন।‌ 
নদীর তীরে বালুতে ফুটবল খেলছি আমরা সবাই

আমাদের ফুটবল খেলতে অনেক কষ্ট হয়েছিল। আমরা ফুটবল খেলতে গিয়ে সবাই ঘেমে ভিজে গিয়েছিলাম। 

তাই, আমরা সবাই নদীতে গোসল করতে করলাম। 

সেখানে গাছের পাতা দিয়ে আমার ভাই-বোন ও বাবা নৌকা ভাসিয়ে খেলছিল। যদিও আমি সেই খেলা খেলিনি। 
নদীর তীরে বাবা ও আমার বোনেরা নৌকা ভাসিয়েছে

আমি নদীর তীরে অন্য জায়গায় বসে বালু নিয়ে ঘর তৈরি করছিলাম। এমন সময় পাশের ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো একটি ছোট্ট কচ্ছপ। 

কচ্ছপের আস্তে আস্তে হাঁটা আমি খুবই উপভোগ করলাম। দুই হাতে পানি নিয়ে তাঁর গায়ের উপর পানি দিলাম, সে চুপ করে বসে পড়লো এবং আমি সরে যেতেই সে আবার চলা শুরু করলো। 

এক সময় তাঁর সাথে আমার বন্ধুত্ব হল এবং আমি তাঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। 

বাবা কে বললাম আমি একটা ছোট্ট কচ্ছপ 🐢 পেয়েছি। আমি কি সেটা বাড়িতে নিয়ে যেতে পারি?

বাবা প্রথমে আমার কথা রাখলেন না। 

এরপর, আমি তাকে আবারো অনুরোধ করলাম এবং বললাম এই কচ্ছপটা আমি আমার অ্যাকুরিয়াম এর মধ্যে রাখবো।‌ সে এবার রাজি হল।‌ 

আমি কচ্ছপটিকে একটি বয়ামের ভিতর রাখলাম এবং সন্ধ্যার সময় বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম। গাড়িতে বসে আমার ভাই বোন কচ্ছপ কে দেখে খুবই অবাক হয়েছিল এবং বার বার কচ্ছপ রাখা বয়াম নাড়ছিল। 

একবার খুবই মজার ঘটনা ঘটল। বাবা গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং হঠাৎ ব্রেক করলো। তারপর কচ্ছপ টা বয়ামের মাঝ থেকে একটু সরে গেল এবং তা দেখে আমার ছোট বোন (বৃষ্টি) কান্না শুরু করলো। 

সে এতোটাই ভয় পেয়েছিল যে, গাড়িতে থাকার পুরো সময়টা সে কান্না করলো। 

বাড়িতে পৌঁছানোর পর সে কান্না থামালো। 

আমি তো রেগে আগুন। তার কান্নার আওয়াজ এতোটাই জোরে ও বাজে শোনাচ্ছিলো যে আমি আমার ঘরে ঢুকেই শুয়ে পড়লাম এবং আমি আমার কান থেকে হাত সরিয়ে নিলাম। 

এভাবে আমাদের গ্ৰাম ভ্রমণের শেষ হল। 

দিন শেষে রবিন ছোট্ট কচ্ছপটির সঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলোর কথা মনে করল। পরিবারের সঙ্গে এই গ্রাম ভ্রমণ তার কাছে স্মরণীয় হয়ে রইল।

আরো গল্প পড়ুন,






এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url